কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে পুশইনচেষ্টার শিকার হয়ে নারী ও দুই শিশুসহ ৯ জন তিন দিন ধরে আন্তর্জাতিক শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো এই ৯ জনের মধ্যে ছয়জনের বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায়। বাড়ি থেকে রাগ করে দালালের খপ্পরে পড়ে তারা ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। পরে গুয়াহাটিতে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে রাতের অন্ধকারে তাদের বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করা হয়। বর্তমানে শূন্যরেখায় আটকে থাকায় চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন তাদের স্বজনরা।
শূন্যরেখায় অবস্থান করা ছয়জন হলেন ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকূল গ্রামের রুপ মিয়ার ছেলে বিল্লাল হোসেন (২৮), তার স্ত্রী সুমি আক্তার (২৭), তাদের চার বছর বয়সী মেয়ে ফাতেমা ও ছয় মাস বয়সী মেয়ে ফাহিমা। এ ছাড়া, রয়েছেন বিল্লালের মায়ের মামাতো ভাইয়ের ছেলে হিমেল মিয়া (২০) এবং বিরুনিয়া কাইচান কশাইপাড়া এলাকার রিটন মিয়ার ছেলে সজিব মিয়া (২৫)।
বিজিবি ও সীমান্তে আটকে থাকা ব্যক্তিদের স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ জুন দলটি এলাকা ছাড়ে। পরে তারা সিলেটের একটি মাজারে গিয়ে অবস্থান করেন। এরপর ৯ জুন সেখানকার এক দালালের মাধ্যমে ভারতে চলে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে গুয়াহাটি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এ ঘটনায় ১২ জুন আসাম নিউজ নামের একটি অনলাইনেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।
স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, গত রোববার ভোরে ভারতের ঝালুরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা এক নারী, তিন পুরুষ ও দুই শিশুসহ ছয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া সীমান্তের আন্তর্জাতিক ১০৬০ নম্বর মেইন পিলারের ১ নম্বর সাব-পিলার এলাকার শূন্যরেখায় তারা অবস্থান করছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধা এবং বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। এরপর থেকেই তারা আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।
বর্তমানে তাদের চারপাশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া সামান্য খাবার ও পানি খেয়ে দিন কাটছে তাদের। ঘটনার পর রোববার দুপুরে বিজিবি ও বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে জরুরি পতাকা বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি।
সীমান্তরেখায় আটকে থাকা সজিব মিয়ার বাড়ি বিরুনিয়ার কাইচান কশাইপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, তাকে ঘিরে পরিবারের উৎকণ্ঠার শেষ নেই। বাড়িতে রয়েছে মাটির একটি ঘর। পলিথিনের ছাপড়া ঘরে রান্না করছিলেন তার সৎমা ফাতেমা আক্তার। পাশেই দাদি রুমেনা খাতুন বারবার নাতিকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছিলেন। সজিবের জেলে বাবা একটি মৎস্য খামারে জাল টানতে যাওয়ায় তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সজিবের বয়স যখন সাত বছর, তখন তার মা তাকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করেন। পরে বাবা রিটন দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সজিব শারীরিক ও মানসিকভাবে ততোটা সুস্থ নয়। প্রায় তিন বছর আগে ভালুকা পৌরসভার গ্যাস অফিস এলাকায় রিয়া আক্তার নামে এক নারীকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে মারিশা আক্তার নামে ১৮ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। স্ত্রীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে থাকলেও গত ৬ জুন দাদির বাড়িতে যায় সজিব। সেখানে সে দাদির কাছে ভারতে যাওয়ার জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা চেয়েছিল। এলাকার বিল্লাল তাকে কাজ দেওয়ার কথা বলে ভারতে নিয়ে যেতে চাইলে দাদি টাকা দেননি।
সজিবের দাদি রুমেনা খাতুন বলেন, '১৫শ টেহা চাইছিন নাতি দিছি না কইরা রাগ করছে। ভারতে গিয়ে ভাঙ্গারি ব্যবসার করার কথা বলে আমার নাতিরে নিয়ে যায় বিল্লাল। বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় আমাদের বলেও গেছে না। পরে মাইনস্যে কইছে আমার নাতি ধরা পড়ছে সীমান্তে। আমরারে খবর দিছে পরে কাগজপত্র পাঠাইছি। টেহার লাগি একজন গার্জেন পাডাইতে পারতাছি না। আমার নাতিডারে দেশে ফিরাইয়া দেন।‘




