পঞ্চগড় থেকে ঢাকার দিকে ছুটে চলা ‘দ্রুতযান এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলায় পৌঁছালে পাথর ছুড়ে মারেন কেউ একজন। সেই পাথর এসে লাগে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেনের ডান চোখে। চলন্ত ট্রেনে মঙ্গলবার বিকালে ছোড়া সেই পাথরের আঘাতের পর সাব্বিরকে নিকটবর্তী জামতৈল রেলওয়ে স্টেশনে নামিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর নেওয়া হয় ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) একাদশ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর ডান চোখের নিচের হাড় ভেঙে গেছে। তার দৃষ্টিশক্তিও ‘ফেরার সম্ভাবনা নেই’। চোখের নিচের হাড়ের চিকিৎসার জন্য সাব্বিরকে চক্ষু হাসপাতাল থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে জাতীয় নাক, কান ও গলা ইনস্টিটিউটে।
চিকিৎসকদের বরাতে সাব্বিরের বাবা দুলাল হোসেন বলেন, "ছেলের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি আর ফেরার সম্ভাবনা নেই। চোখের নিচের হাড় ভেঙে গেছে। সেটার অপারেশনের জন্য চক্ষু হাসপাতাল থেকে এখানে (ইএনটি) স্থানান্তর করা হয়েছে।” অপারেশন করতে দেড় লাখ টাকা লাগার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, "আজ (বুধবার) এক দিনে এত টাকা সংগ্রহ করতে পারিনি। কাল (বৃহস্পতিবার) সব গোছাতে পারলে অপারেশন হবে৷”

ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে এমন রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনা এই নতুন নয়। প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয় এমন ঘটনা। মাস দুয়েক আগেও ১৭ মে পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনের এক যাত্রীর কপালে আঘাত হানে পাথর। অল্পের জন্য রক্ষায় পায় তার চোখ। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক এম এ বি ছিদ্দিক মজুমদার সেদিন সিলেট থেকে যাচ্ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ভৈরব বাজার সেতুর ঠিক আগে অন্ধকারের মধ্যে একটি ঢিল এসে তার কপালে লাগে। এতে তার কপালের খানিকটা ফুলে যায়। একটু এদিক-ওদিক হলে চোখও হারাতে পারতেন।
ঘটনার পর বিষয়টি ফেইসবুকে তুলে ধরে পাথর নিক্ষেপকারীকে উদ্দেশ করে ওই চিকিৎসক লেখেন, "আপনার মানসিক বিকৃতির এই আনন্দ আমার অনেক বড় ক্ষতির কারণ হতে পারত। আল্লাহর রহমতে খুবই অল্পের উপর দিয়ে গেছে। দয়া করে ট্রেনে পাথর ছুড়বেন না। মানুষের ক্ষতি করবেন না।”
পোস্টের সূত্র ধরে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, নিজের এরকম অভিজ্ঞতা প্রথম হলেও এ ধরনের ঘটনা আগেও দেখছেন তিনি। এই চিকিৎসক বলেন, "আমি ছেলেবেলা থেকেই এই রুটে যাতায়াত করি। পাথর মারতে আগেও দেখেছি, নিজে শিকার হব ভাবিনি। এই রুটে এটা হয়। এই প্লেসটা খুব কমন প্লেস, ভৈরবের আগের জায়গাটা।”

পাথর নিক্ষেপ নতুন নয়
ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা অনেক আগে থেকেই ঘটে। তবে বর্তমানে এ ধরনের ঘটনায় প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে আসছে। এর আগে গত ২৭ এপ্রিল কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে দুই যাত্রী আহত হন। এরমধ্যে মোহাম্মদ হিমেল আহমেদ নামে এক যাত্রীর চারটি দাঁত ভেঙে যায় এবং নিচের ঠোঁটের ভেতরের অংশ ফেটে যায়। ঘাড়ে আঘাত পান আরেক যাত্রী মোহাম্মদ আবু সাঈদ।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ট্রেনটি দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার স্টেশন ছেড়ে আসে। আহত ওই দুই যাত্রী নন-এসি কোচের যাত্রী ছিলেন। কক্সবাজারের চকরিয়া এলাকা অতিক্রমের সময় বাইরে থেকে একটি পাথর ছুড়ে মারা হয়। এতে ওই দুই যাত্রী আহত হন। পরে তাদের চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বর্তমানে কক্সবাজার রুটে চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে, এর মধ্যে দুটি ঢাকা-কক্সবাজার এবং দুটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে। যাত্রীচাহিদা বাড়লে বিশেষ ট্রেনও চালানো হয়। জনপ্রিয় এই রুটে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা এখন যাত্রীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহরগামী শাটল ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে ট্রেন চালক আহত হন। ওইদিন নগরীর আমিন জুট মিল এলাকায় এ ঘটনায় মাথায় আঘাত পান লোকোমাস্টার মো. ওমর ফারুক।

কেন এত পাথর নিক্ষেপ
বাংলাদেশে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট এবং বছরভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ কোনো একক সংস্থার কাছে নেই। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ে, বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন যাত্রী অধিকার রক্ষা সংগঠনের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি চিত্র পাওয়া যায়।
রেলওয়ের বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশে গড়ে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। সেই হিসাবে গত ১০ বছরে এই সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজারের কাছাকাছি। তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুধু রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলেই অন্তত ১৪৫টি এমন ঘটনা ঘটেছে, যাতে ৩৯ জন যাত্রী ও রেলকর্মী আহত হয়েছেন। এছাড়া ট্রেনের দরজা ও জানালাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসময়ে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজার রুটে। এই রুটে গত এক বছরে অন্তত ৩৮টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় ১৪ জন আহত হয়েছেন বলে খবরে উঠে এসেছে।
এছাড়া ২০২২ সালে সারাদেশে ট্রেনে অন্তত ১১৬টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় ৩৪ জন যাত্রী ও রেলকর্মী আহত হয়েছেন। ২০২১ সালে সারাদেশে অন্তত ১১০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল, এসব ২৯ জন যাত্রী ও রেলকর্মী আহত হন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতে এই পাথর নিক্ষেপকে ট্রেনের নিরাপত্তার জন্য ‘বড় হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে এই ধরনের ঘটনায় অন্তত ১০-১২ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে এবং শত শত যাত্রী আহত হয়েছেন। কেউ-কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
বুয়েটের দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, রেললাইনের পাশে ঘনবসতি ও বস্তি এলাকা এবং সচেতনতার অভাবই এর মূল কারণ। কিছু ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রেললাইনের যেসব অংশে ঝোপঝাড় বেশি, সেসব জায়গা থেকে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। নির্জন রেলসেতু বা নির্জন অঞ্চলেও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাঈদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ুট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে কিন্তু শুধু কৌতূহল থেকে। এতে কোনো চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই।”

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা কোনগুলো
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন নিরাপত্তা বিষয়ক পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন সময়ে সারাদেশের প্রায় ২০টি জেলার নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে চিহ্নিত করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঢাকার তেজগাঁও, গাজীপুরের টঙ্গী ও জয়দেবপুর, কক্সবাজারের রামু, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এবং কিশোরগঞ্জের ভৈরব এলাকা পাথর নিক্ষেপের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে খুলনা, রাজশাহী ও ঈশ্বরদী রুটে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটে।
বড় অঙ্কের ক্ষয়ক্ষতি
ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের কারণে শুধু যাত্রীরা হতাহত হচ্ছেন, এমন নয়। ট্রেনেরও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। রেলওয়ের মেকানিক্যাল বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, রেলে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় প্রতি বছর গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০টি জানালার কাচ ভেঙে যায়। একেকটি উন্নত মানের কাচ প্রতিস্থাপনে ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়, যার ফলে সরকারের প্রতি বছর বড় অংকের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
রেলওয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে অন্তত ১১৬টি ঘটনায় ১০৯টি ট্রেনের জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২১ সালে সারাদেশে অন্তত ১১০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় ট্রেনের ১০৩টি জানালার কাচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আইন কী বলছে?
১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ আইনের ১২৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি চলন্ত ট্রেনে বা রেললাইনে পাথর, কাঠ বা এমন কিছু নিক্ষেপ করেন বা রাখেন, যা যাত্রীদের নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ধারায় অপরাধীর ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনের ১২৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি চলন্ত ট্রেনের বগি লক্ষ্য করে পাথর বা অন্য কিছু ছুড়ে মারেন এবং এর ফলে যাত্রীদের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে বা কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হন, তবে এই ধারায় অপরাধীকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সাথে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ১৩০ ধারায় বলা হয়েছে, পাথর নিক্ষেপকারী যদি কোনো শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক (১২ বছরের কম বয়সী) হয়, তবে এই আইনের অধীনে তার অভিভাবককে জরিমানা বা শাস্তির আওতায় আনা হয়।
পাথর নিক্ষেপের কারণে যদি কোনো ট্রেনযাত্রী গুরুতর আহত হয়ে মারা যান, তবে সেটি আর শুধু রেলওয়ে আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) ৩০২ ধারা অনুযায়ী খুনের মামলা করা হয় এবং অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি) পর্যন্ত হতে পারে। যদিও রেলওয়ে আইন ১৮৯০ অনুযায়ী এই অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এমনকি মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে অপরাধী শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা বন্ধ করা যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, "এই যে পাথর নিক্ষেপ, বিষয়টা নিয়ে আসলে আমাদের প্রশাসন তথা সরকারকে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে। রেলকে বলা হয় নিরাপদ বাহন, সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন হওয়ার কথা রেল। "এখন এই রেলকে লক্ষ্য করে, কোনো গোষ্ঠী রেলকে অজনপ্রিয় করার চেষ্টা করছে কিনা, এটা সিরিয়াসলি কিন্তু খতিয়ে দেখতে হবে। কেননা, বাইরে থেকে পাথর নিক্ষেপের ফায়দাটা কিন্তু খুব একটা স্পষ্ট না। কারণ যদি এমন হত যে, সেটা রেলে স্যাবোটাজ করার জন্য অথবা এখানে ডাকাতির উদ্দেশ্যে, এরকম কিন্তু বিষয় না। জাস্ট জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা।” তিনি বলেন, "এই আতঙ্ক তৈরি করে ট্রেনকে, ট্রেন ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি বা ট্রেনকে অজনপ্রিয় করার চেষ্টা কেন করছে, কে করছে, এই জিনিসটা প্রশাসন তথা সরকারের সিরিয়াসলি ভাবতে হবে।”
অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘুরেফিরে কিছু ‘স্পটে’ ঘটছে বলে মনে করেন এই অধ্যাপক। পাথর নিক্ষেপ বন্ধে এসব এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ তার। রেলের আউটডোরে ক্যামেরা বসানোর মত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, "এ সব ক্যামেরা যেন দূরবর্তী স্থান পর্যন্ত দেখতে পারে, যাতে ঘটনা ঘটার পরেও অপরাধীকে শনাক্ত করা যায়। "যে জায়গাগুলোতে ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়, সেখানে যারা বসবাস করেন, তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং তাদের নিয়েই একটা কমিটি তৈরি করা যেতে পারে, যারা এই নজরদারিটা করবে এবং প্রয়োজনে প্রশাসনকে যেন জানাতে পারে।” সচেতনতা বাড়াতে ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজের সদস্যদের নিয়ে একটা কমিটি করার পরামর্শ দেন হাদিউজ্জামান। "যাদের কাজ হবে এটা তদারকি করা এবং কোনো ধরনের ঝুঁকি বা এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে আশঙ্কা থাকলে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট জানানো।”

মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলেন, "অতীতেও এটা নিয়ে কথা বলেছি। আমাদের যে পর্যবেক্ষণ, সেটা হচ্ছে যে, এই পাথর নিক্ষেপ করার ঘটনাটা কৌতূহলবশত করে, বিষয়টা কিন্তু আমরা মানতে রাজি নই। "কারণ, কৌতূহলের জন্য একটা দুইটা ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু ফ্রিকোয়েন্টলি যখন একটা ঘটনা ঘটে, তখন সেটার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বোঝার জন্য যথেষ্ট সক্ষমতা থাকা উচিত।” এই অধ্যাপক বলেন, "কিশোর বয়সের যারা আছে, তারা কিন্তু এটা ঘটিয়ে থাকে বেশি। এবং তারা কিন্তু বিভিন্ন ধরনের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত আছে, সে কিশোরেরা মাদকের সঙ্গে যুক্ত আছে। তারা এটা ঘটিয়ে থাকে। "আর একটা শ্রেণি আছে যে, নাশকতার জন্য, রাষ্ট্র পর্যায়ে তার যদি কোনো অসন্তুষ্টি থাকে, অথবা কোনো মানুষ যদি মনে করে সে সাপোর্ট পাচ্ছে না নাগরিক হিসেবে, তখন কিন্তু এই মানসিকতা একটা দ্বান্দ্বিক মনোভাব তৈরি করে। এরকম যে, যারা যাচ্ছে ট্রেনে, তারা প্রিভিলেজড, আমরা আন্ডার প্রিভিলেজড।” তিনি বলেন, "সমাজের মধ্যে একটা অসম শ্রেণি ব্যবস্থা যেটা তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সে জায়গা থেকেও কিন্তু একটা ক্ষোভ রয়েছে। এ ক্ষোভ থেকেও কিন্তু তারা এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটায় প্রতীকী হিসেবে। এবং সেটা বোঝানোর চেষ্টা করে যে তাদের অসন্তুষ্টির লেভেল এবং মাত্রাগুলোকে গভর্নমেন্টের কাছে মেসেজ দেওয়ার জন্য।” এই অপরাধ বন্ধে রেলওয়ে পুলিশের নিরাপত্তা সক্ষমতা উন্নত করার কথা বলেন তিনি। এজন্য রেলপথে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পরামর্শ দেন। "আমাদের তো সেই ব্যবস্থা নাই। আধুনিক সময়ে এটা এখন সময়ের দাবি হয়ে আসছে। প্রত্যেকটা গেটের কয়েক কিলোমিটার অন্তর-অন্তর একটা সারভাইলেন্স টিম তৈরি করতে হবে। যারা একটা স্টেশন থেকে আরেকটা স্টেশনের মধ্যে দায়িত্ব পালন করবে।”
স্থানীয় পর্যায়ে কিছু ‘ইনফরমার’ নিয়োগের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, "কিছু ইনফরমার তৈরি করা, যেটা অ্যাপয়েন্টেড করবে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়। আমাদের রেলওয়ে লাইন কিন্তু খুব বেশি না বাংলাদেশে। "অতএব, দুই তিন কিলোমিটার অন্তর অন্তর আমরা যদি কিছু ইনফর্মার অ্যাসাইন করি এবং গভর্নমেন্টের কিছু প্রণোদনা যদি তাদেরকে দেওয়া হয়, আমি চাকরি বলছি না। অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবেই তাদেরকে অ্যাসাইন করা হবে।”
রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাঈদুর রহমান বলেন, "এটা (পাথর নিক্ষেপ) বাড়ছে। এটার প্রতিরোধ করতে হলে স্থানীয় কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করতে হবে। রেলপথ ঘিরে যে জনপদগুলো আছে, যে সমস্ত এলাকায় এগুলো ঘটে, সেখানকার যে স্থানীয় প্রতিনিধি আছে, তাদেরকে নিয়ে বৈঠক করতে হবে সরকারকে।” পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে ফলাও করে প্রচারের পরামর্শ দেন তিনি।
কী বলছে রেলওয়ে
রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, রেলের পশ্চিমাঞ্চলেও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ), শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন, চাটমোহর (পাবনা) "এসব এলাকায় মাঝে মাঝে ঘটে। "এটা প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের রেলওয়ে সিকিউরিটি ফোর্স (আরএনবি) এবং জিআরপি পুলিশ, এরা অলরেডি বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে ওই সমস্ত এলাকার স্কুল-কলেজ এবং মসজিদগুলোতে তারা লিফলেট বিতরণ করছে এবং জুমার নামাজের আগে সচেতনতামূলক বক্তব্য দিচ্ছে। "এছাড়া আমাদের রেলওয়ের যে ট্র্যাক বা লাইন, লাইনের আশপাশের গানম্যানদেরকেও বলা আছে, যে কারো মুভমেন্ট যদি সন্দেহজনক মনে হয়, তবে যেন সঙ্গে সঙ্গে আরএনবি বা পুলিশকে ইনফর্ম করে। তো এই সমস্ত কার্যক্রমগুলো আমাদের এখানে চলমান আছে।”

চটগ্রাম বিভাগীয় রেলওয়ের পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদ দুর্ঘটনা বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তারা সংশ্লিষ্ট জিআরপি, এসআরপি চট্টগ্রামকে চিঠি দিয়েছেন। এই পাথর নিক্ষেপের বিষয়টি মূলত রেলওয়ে পুলিশ আর আরএনবি দেখে। গত ১৮ মে জাজিরাহাটের দিকেও পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, "রামু সেকশনে একটু বেশি হয় পাথর নিক্ষেপ। আমরা নিজেরাও ইনসিকিউরড ফিল করি, এটা কমছে না। এটা অনবরত হচ্ছেই। এ বিষয়ে আমরাও কিছুটা উদ্বিগ্ন। "আরেকটা বিষয় হচ্ছে, কক্সবাজার সেকশনের স্টেশনগুলোতে জিআরপি নেই, আরএনবিও নেই। এজন্য আমরা তাদেরকে ওখানে পদায়ন করার জন্য বলেছি। কিন্তু জনবল সংকট বলে উনারা (ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ) পদায়ন করতে পারছেন না।”
সার্বিক বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, "শুধু রামু না, অনেক স্থানেই এটা (পাথর নিক্ষেপ) হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে হচ্ছে, আখাউড়া হচ্ছে।” এজন্য জনসচেতনার অভাবকে দায়ী করে সচিব বলেন "এটা এদেশের মানুষের একটা সমস্যা। গ্রামে মধ্যরাতে ঢিল মারছে, বা দিনে মারছে। অনেকে খেলার ছলে মারছে, কেউ ইনটেনশনালি মারছে।" "ওই জনসচেনতা তৈরি করার জন্য আমরা অলরেডি ইস্ট জোনে, জিএম ইস্ট সাহেব আজকেও আমার সঙ্গে কথা বলেছে, উনারা একটা ক্যাম্পেইনের আয়োজন করছে।”
জনবল সংকট ও ফাঁড়ি না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, "ফাঁড়ি তো একটা পার্টিকুলার জায়গায় থাকবে। চট্টগ্রামেতো আছে। এখন একটা ট্রেন রান করছে মানে হান্ড্রেড মাইলস, হান্ড্রেড কিলোমিটারস ধরে যাচ্ছে। কয়টা ফাঁড়ি দিয়ে আপনি কী করবেন?”
রেলযাত্রায় যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়ে এবারের ডিসি সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনিও জনসচেতনতা বাড়ানোয় গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ুদেখা গেল খেলা করতে করতে বাচ্চারা গ্লাস ভাঙছেন। তো ওই অঞ্চলের মানুষকে সচেতন করা, সজাগ করা, সেটাও একটা অংশ, সবভাবে চেষ্টা চলছে।
সূত্র : বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোর ডটকম।






