আমান উল্লাহ আকন্দ জাহাঙ্গীর : আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর হাটে ইতিমধ্যে ক্রেতাদের ভীড় বাড়তে শুরু করেছে। চলছে পছন্দের পশু কেনাকাটার কাজ। তবে এ সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ি অধিক লাভের আশায় স্টেরয়েড, গ্রোথ হরমোন এবং ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে পশু মোটাতাজা করে তুলছেন হাটে। এতে পশুর স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বলে সর্তকবার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলম মিয়া।
বৃহস্পতিবার বিকালে কোরবানির পশুর হাট প্রসঙ্গে এক সর্তকবার্তায় এই প্রাণী বিশেষজ্ঞ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে খুব সহজেই গরু মোটাতাজা করা সম্ভব। এজন্য ২ থেকে ৪ বছর বয়সী স্বাস্থ্যবান গরু নির্বাচন, নিয়মিত কৃমিনাশক প্রয়োগ, সুষম খাদ্য সরবরাহ, ভিটামিন-মিনারেল প্রিমিক্স ব্যবহার এবং পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এভাবেই সঠিক ব্যবস্থাপনায় ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যেই একটি গরু ভালোভাবে মোটাতাজা করা সম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অধিক লাভের আশায় ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে পশু মোটাতাজা করা হচ্ছে। এতে বাড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি।
কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা পশু চেনার উপায় :
অধ্যাপক আলম মিয়া বলেন, কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরুর নাক সাধারণত শুকনো থাকে। এসব গরুর শরীর থলথলে হয় এবং দেহে অতিরিক্ত পানি জমে থাকে। একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়। গরুগুলোকে ক্লান্ত ও অলস দেখায়। অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয় কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশুর।
অধ্যাপক আলম মিয়া আরো জানান, কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরুর শরীরে হাত দিলে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কম দেখা যায়। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে শরীরের অংশ দেবে যায় এবং তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে। এসব গরুর রানের মাংস অস্বাভাবিক নরম হয় এবং হাড়ও তুলনামূলক দুর্বল থাকে। ফলে দুর্ঘটনায় হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তিনি আরও বলেন, এসব গরুর খাওয়ার আগ্রহ কম থাকে এবং নিয়মিত জাবর কাটে না। অনেক সময় মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা বা ফেনা বের হতে দেখা যায়। দীর্ঘ পথ হাঁটিয়ে হাটে আনার পর তারা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং একবার বসে গেলে সহজে উঠতে চায় না।
সুস্থ গরু চেনার উপায় :
প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলম মিয়া একটি সুস্থ গরুর বর্ণণা তুলে ধরে বলেন, সুস্থ গরুর নাক ভেজা বা ঘামযুক্ত থাকবে। চোখ উজ্জ্বল থাকবে এবং শরীরে হাত দিলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। সুস্থ গরু চঞ্চল স্বভাবের হয়। এরা খাবার দেখলে খেতে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং নিয়মিত জাবর কাটে। এছাড়া সুস্থ গরুর চামড়া টানটান ও চকচকে থাকে। তিনি আরো জানান, গরুর শরীরে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে যদি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসে তাহলে সেটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা হওয়ার লক্ষণ। অন্যদিকে চাপ দেওয়ার পর দেবে থাকলে বুঝতে হবে শরীরে অতিরিক্ত পানি জমেছে।
এ সময় খামারিদের উদ্দেশে ড. আলম মিয়া বলেন, অনেক খামারি হাতুড়ে চিকিৎসকদের পরামর্শে ডেক্সামেথাসন, প্রেডনিসোলনসহ বিভিন্ন স্টেরয়েড ব্যবহার করে পশু মোটাতাজা করেন। এসব ওষুধ পশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে। এ কারণে হঠাৎ পশুর মৃত্যুও ঘটতে পারে।
পাশাপাশি কোরবানির পশু ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে এই প্রাণী বিশেষজ্ঞ বলেন, কোরবানির পশু কেনার সময় শুধু আকার নয় বরং পশুর আচরণ, শ্বাস-প্রশ্বাস, নাকের অবস্থা ও চলাফেরা খেয়াল করতে হবে। সন্দেহ হলে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।




