বিংশ শতাব্দীতে শিল্পায়নের উন্মেষ ঘটার সাথে সাথে বেশ কিছু রাসায়নিক দ্রব্যাদি জগতে তৈরি করা হয়- যা পানি, তেল ও তাপ প্রতিরোধক। এরা অবিনাশী এব্ং চিরস্থায়ী। কালের পরিক্রমায় এসব সিনটথেটিক রাসায়নিক পদার্থই মানবসভ্যতার জন্য নীরব ঘাতক হয়ে দাড়িয়েছে। এমন নীরব ঘাতক রাসায়নিকের একটি জটিল গ্রুপের নাম PFAS; পুরো নাম Per - and Polyfluoroalkyl Substances। এই গ্রুপের আওতায় ১২ থেকে ১৫ হাজার রাসায়নিক দ্রব্য রয়েছে বলে জানা যায়। এসব রাসায়নিকের কার্বন এবং ফ্লোরিন এটম অবিশ্বাস্যরকমের এক শক্তিশালী বন্ধনে থাকে। ফলে পরিবেশ ও মানবদেহে এগুলো প্রাকৃতিকভাবে কখনো ভাংগে না এবং শত শত বছর টিকে থাকে। এজন্য এদেরকে Forever Chemicals বা চিরস্থায়ী রাসায়নিকও বলা হয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে এসব রাসায়নিক পদার্থ শিল্পজাত পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মোটা দাগে এসব রাসায়নিক দ্রব্য কোথায় কোথায় থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত নন-স্টিক ফ্রাই প্যান, রাইস কুকার, মাইক্রোওয়েভ, পানি নিরোধক কাপড়, ছাতা, রেইনকোট, মাস্কারা, শ্যাম্পু, লিপস্টিক, ডেন্টাল ফ্লস, ইত্যাদিতে PFAS পাওয়া যায়। তাছাড়া, পানি নিরোধক পপকর্ন ব্যাগ ও ফাস্ট ফুডের ডেলিভারি মোড়কেও PFAS থাকে। মাটি, পানি, বাতাস ও বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্যের মাধ্যমে PFAS মানবদেহে অনুপ্রবেশ করে এবং রক্তে জমা হয়। এতে লিভার, কিডনি ও থাইরয়েডে ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হয়, প্রজনন সক্ষমতা ও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় এবং দেহে ভ্যাকসিন এর কার্যকারিতা হারাতে পারে।
দেশি- বিদেশি গবেষণায় বাংলাদেশে শিল্পাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি, নদী এবং এমনকি সাধারণ পানিতেও PFAS এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা Environment and Social Development Organisation (ESDO) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা IPEN (International Pollutants Elimination Network) এর যৌথ গবেষণায় ঢাকার চারপাশের নদ-নদী এবং কক্সবাজারের বাঁকখালী নদী ও উপকূলীয় এলাকায় PFAS উপস্হিতি পাওয়া গেছে। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল এলাকাতে ট্যাপের পানিতেও PFAS পাওয়া গেছে বলে আলোচ্য গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। উক্ত গবেষণা ফলাফল ২০২৪ সালে ঢাকায় একটি সেমিনারে উপস্থাপন করা হয় এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়। বিষয়টি উদ্বেগ উৎকন্ঠার। অতএব আমাদের যাপিত জীবন এবং খাদ্য দ্রব্যে অবিনাশী এই ক্ষতিকর PFAS এর উপস্থিতি হ্রাস বা নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর নজরদারিসহ PFAS ব্যবহারের ক্ষেত্রে গবেষণা ফলাফল ভিত্তিক জাতীয় নীতিমালা বা আইনী বাধ্যবাধকতা থাকা প্রয়োজন ।
লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট।





