ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, লোককথা এবং ব্রিটিশবিরোধী ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের স্মৃতি বহন করে প্রায় সাত শতক ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার হরিপুর দেওলী গ্রামের ঐতিহাসিক ভূঁইয়া বাড়ি জামে মসজিদ। ইট-সুড়কির গাঁথুনিতে নির্মিত দুই গম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাচীন মসজিদটি শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন।
তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অযত্নে বর্তমানে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে স্থাপনাটি। খসে পড়ছে পলেস্তারা, দেওয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার না হলে যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রত্ননিদর্শন।

ঐতিহাসিকদের তথ্য অনুযায়ী, আঠারো শতকের শেষ দিকে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময় আত্মগোপনে থাকা ফকিররা নামাজ আদায়ের জন্য গহিন জঙ্গলের মধ্যে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে ১১৩৫ বঙ্গাব্দে এর সর্বশেষ সংস্কার করা হয়। এরপর প্রায় ৩০০ বছর পেরিয়ে গেলেও আর কোনো বড় ধরনের সংস্কার হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে মসজিদটি শুধু একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়, রহস্যময় এক নিদর্শনও। তাদের দাবি, মাঝেমধ্যেই মসজিদের দেওয়াল থেকে ঘামের মতো পানি ঝরতে দেখা যায়। কখনো সেই পানিতে জয়নামাজ পর্যন্ত ভিজে যায়, আবার কিছু সময় পর অলৌকিকভাবে দেওয়াল শুকিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ ঘটনা এলাকাবাসীর কাছে বিস্ময়ের বিষয় হয়ে থাকলেও এর বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০১৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করলেও বাস্তবে এখনো কোনো দৃশ্যমান সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। এমনকি সংরক্ষিত পুরাকীর্তির পরিচয় বহনকারী একটি সাইনবোর্ডও নেই। ফলে অবহেলা আর অযত্নে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শন।
মসজিদের খতিব মো. বাদী বিল্লাহ বলেন, এই মসজিদের একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাইরে যতই গরম থাকুক, ভেতরে প্রবেশ করলে শীতল পরিবেশ অনুভূত হয়। অনেক মানুষ শুধু কিছুক্ষণ বসে মানসিক প্রশান্তি নিতে এখানে আসেন। মাঝেমধ্যে দেওয়াল থেকে এমনভাবে পানি ঝরে যে জয়নামাজ পর্যন্ত ভিজে যায়, আবার কিছুক্ষণ পর সেটি নিজে থেকেই শুকিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, আগের অনেক বুজুর্গ রাত জেগে এখানে ইবাদত করতেন। তাদের কাছ থেকে আমরা অনেক অলৌকিক ঘটনার কথা শুনেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই মসজিদে নামাজ পড়ে যে মানসিক প্রশান্তি পাই, অন্য কোথাও তেমন অনুভব করি না।
মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগেকার যুগে ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র ছিল মসজিদ। তখনকার আল্লাহভীরু মানুষই এসব মসজিদ নির্মাণ করতেন। তবে কারা এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। প্রবীণ মুসল্লিদের ভাষ্য, তাদের দাদা-পরদাদারাও মসজিদের প্রকৃত নির্মাণকাল নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। তবে এটি যে অত্যন্ত প্রাচীন, সে বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই।
স্থানীয় মুসল্লি আবুল হোসেন বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরাও ঠিক কত বছরের পুরোনো এই মসজিদ, তা বলতে পারেননি। তবে ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি এটি বহু শত বছরের পুরোনো। এখানে নামাজ পড়লে আলাদা ভালো লাগে। আরেক মুসল্লি কাদির মিয়ার ধারণা, মসজিদের নির্মাণশৈলী, ব্যবহৃত ইট ও গাঁথুনির ধরন দেখে মনে হয় এটি মুঘল আমল বা তার কাছাকাছি সময়ের। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা হলে প্রকৃত ইতিহাস জানা সম্ভব।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ আলী জানান, মসজিদের পাশে দুটি পুরনো কবর ছিল। এর মধ্যে একটি প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। পুরো স্থাপনাটিই ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এটি আর দেখতে পাবে না। স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই মসজিদ দেখতে আসেন। ময়মনসিংহ জাদুঘরেও মসজিদটির ছবি রয়েছে বলে জানান তারা।







