চোখের সামনে এখন আর কোনো দৃশ্য নেই। নেই প্রিয় বিদ্যালয়ের ভবন, সহপাঠীদের মুখ কিংবা সবুজ মাঠ। ২০২৩ সালের সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে তার দৃষ্টিশক্তি। গুরুতর আহত হয়েছে ডান হাত ও বাম পা। জীবন যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু থামেনি রুবিনা আক্তার। চোখের আলো নিভে গেলেও তার স্বপ্নের আলো নিভতে দেয়নি অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার ধরগাঁও গ্রামের এই কিশোরী। ৩ দশমিক ০৬ জিপিএ নিয়ে অর্জিত এই সাফল্য হয়তো প্রচলিত অর্থে বড় ফল নয়; কিন্তু রুবিনার জীবনসংগ্রামের কাছে এটি এক অসাধারণ বিজয়। তবে এই বিজয়ের আনন্দের মাঝেও তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে একটি প্রশ্ন—‘আমি কি আর পড়তে পারব?’
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে রুবিনা বলে, ‘আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে আমি আমার মা-বাবা, সহপাঠী ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু আমার মনে একটাই চিন্তা—আমি কি আরো পড়তে পারব? আমার দিনমজুর বাবার পক্ষে কি এটা সম্ভব? আমার খুব ইচ্ছে পড়াশোনা শেষ করে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া। এর জন্য সমাজের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’
রুবিনা নান্দাইল উপজেলার মুশল্লী ইউনিয়নের ধরগাঁও গ্রামের দিনমজুর রুবেল মিয়ার মেয়ে। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা মেয়েটির ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে শিক্ষক হওয়ার। বই ছিল তার আপন সঙ্গী, বিদ্যালয় ছিল স্বপ্ন পূরণের সিঁড়ি। কিন্তু ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট আচমকাই সবকিছু বদলে যায়।
সেদিন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী রুবিনা সহপাঠীদের সাথে ইজিবাইকে করে স্থানীয় মুশল্লী বালিকা বিদ্যালয়ে যাচ্ছিল। পথে দ্রুতগতির একটি বাস ইজিবাইকটিকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই দু’জন নিহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় রুবিনাকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
মেয়ের জীবন বাঁচাতে দিনমজুর বাবা রুবেল মিয়া সহায়-সম্বল যা ছিল, একে একে বিক্রি করে দেন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বেঁচে যায় রুবিনা। কিন্তু তার বিনিময়ে হারাতে হয় চোখের আলো। দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ডান হাত ও বাম পা।
প্রায় এক বছর চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়ি ফেরে সে। সামনে তখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। চোখে দেখতে পায় না, হাত-পায়ের স্বাভাবিক চলাচলেও সীমাবদ্ধতা। পরিবারের সদস্যদের মনে তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এই অবস্থায় কি আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব?
রুবিনা অবশ্য সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল নিজের কাজ দিয়ে। সে পড়তে চেয়েছে। অনেক বেশি পড়তে চেয়েছে। তার সেই প্রবল আগ্রহের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানেন বাবা-মা। তাকে আবারো স্কুলে ভর্তি করা হয়।
এরপর শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। চোখে বইয়ের অক্ষর দেখা যায় না। তাই শ্রবণশক্তিকেই পড়াশোনার প্রধান অবলম্বন বানায় রুবিনা। সহপাঠীদের পাশে বসে শিক্ষকদের পাঠদান মনোযোগ দিয়ে শুনত। শিক্ষকরা যা বলতেন, তা মনে রাখার চেষ্টা করত। এভাবেই ধীরে ধীরে আবারও বইয়ের জগতে ফিরে আসে সে।
এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিতে হয়েছে একইভাবে। পরীক্ষার হলে তার পাশে বসতেন একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী। রুবিনা মুখে উত্তর বলে দিত, আর সেই শিক্ষার্থী শ্রুতিলেখক হিসেবে খাতায় উত্তর লিখে দিত।
প্রথমবার এসএসসি পরীক্ষায় একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছিল রুবিনা। কিন্তু একটি ব্যর্থতাও তাকে দমাতে পারেনি। বরং নতুন উদ্যমে আবারো প্রস্তুতি নেয়। দ্বিতীয়বার শুধু ওই বিষয়টির পরীক্ষা দিয়ে ৩ দশমিক ০৬ জিপিএ নিয়ে উত্তীর্ণ হয় সে।







