ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশালের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার কথা আজও ভুলতে পারেননি অনেকেই। পিচঢালা সড়কে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে ছিল এক পরিবারের স্বপ্ন। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তঃসত্ত্বা মা রত্না বেগম ও বাবা জাহাঙ্গীর আলম। হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায় তাদের তিন বছরের মেয়ে সানজিদা। আর সেই মৃত্যুমিছিলের মধ্যেই অলৌকিকভাবে পৃথিবীর আলো দেখে সদ্যোজাত শিশু ফাতেমা। মায়ের ছিন্ন উদর থেকে সড়কে ছিটকে পড়েও বেঁচে যাওয়া সেই শিশুটি চার বছরে পা রেখেছে।
চার বছর ধরে ঢাকার আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসেই বেড়ে উঠছে ফাতেমা। এখন সে কথা বলতে শেখেছে। হাসে, খেলে, ছুটে বেড়ায় অন্য শিশুদের সাথে। কিন্তু জানে না, যাদের খুঁজে ফেরে—তার বাবা-মা আর কখনো ফিরে আসবেন না।
অবুঝ কণ্ঠে সে মাঝেমধ্যে প্রশ্ন করে, ‘আমি অ্যাক্সিডেন্ট হইয়া বাইচ্চা রইছি; আব্বা-আম্মা কই?’—এই প্রশ্ন শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না তার দাদা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। শারীরিক প্রতিবন্ধী এই বৃদ্ধ জানান, এত ছোট বয়সে নাতনিকে এমন নির্মম সত্য জানাতে পারেননি তারা। বয়স আরো একটু বাড়ুক, তারপর হয়তো বাস্তবতা বুঝিয়ে বলবেন।
ফাতেমার বাবা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দিনমজুরের সামান্য আয়ে চলত সংসার। তার মৃত্যুর পর ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার। বৃদ্ধ বাবা-মা, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে জান্নাত ও তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র এবাদতকে নিয়ে শুরু হয় কঠিন সংগ্রাম। একটি ছোট দোকানের সীমিত আয়েই কোনোমতে দিন কাটে পরিবারের।
এই দুঃসময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তা পরিবারটিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উদ্যোগে পরিবারটির আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়া হয়। তার নির্দেশনায় সাবেক ছাত্রনেতা নাইমুল করিম লুইনের মাধ্যমে প্রতি মাসে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হচ্ছে একটি পাকা বাড়ি। ফাতেমার অলৌকিক জন্মের স্মৃতি ধরে রাখতে তাদের বাড়ির সামনের সড়কের নামও রাখা হয়েছে ‘ফাতেমা রোড’।
ঈদুল আজহার পরদিন সর্বশেষ নাতনিকে দেখতে ছোটমণি নিবাসে গিয়েছিলেন ফাতেমার দাদা-দাদি। সেদিনও ফাতেমা জানতে চেয়েছিল—‘আমার আব্বা-আম্মা কেমন আছেন?’ প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারেননি তারা। শুধু বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ফিরে এসেছেন।
ছোটমণি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন জানান, জন্মের কয়েক দিন পর থেকেই ফাতেমা তাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। অন্য শিশুদের মতোই তার পড়াশোনা, খেলাধুলা, ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে নিবাসটিতে ছয় বছরের কম বয়সী ৩৭ জন শিশু রয়েছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ছয় বছর পূর্ণ হলে তাকে সরকারি শিশু পরিবার বালিকায় স্থানান্তর করা হবে। তবে পরিবার আবেদন করলে বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরিবারটির পাশে থাকার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি ফাতেমার দাদার দোকানের জন্য ১০ হাজার টাকার মালপত্র, বাড়ি নির্মাণের জন্য টিন এবং বড় দুই ভাই-বোনের স্কুলের বেতন মওকুফের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে, ফাতেমার জন্মের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে ত্রিশালের রায়মণি গ্রামের বাড়িতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে পরিবার। প্রতিবেশীদের নিয়ে খিচুড়ি রান্না করে মরহুম ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতনির মাগফিরাত কামনা করবেন তারা।
চার বছর আগে মৃত্যুর স্তূপের মধ্য থেকে অলৌকিকভাবে জন্ম নেয়া ফাতেমা আজও জীবনের প্রতীক হয়ে আছে। তবে তার নিষ্পাপ চোখে আজও একটি প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়—‘আমার আব্বা-আম্মা কই?’ সেই প্রশ্নের উত্তর জানে সবাই, শুধু জানে না ছোট্ট ফাতেমা।







