বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সমাপনী বর্ষের শিক্ষা সফরে ১৯৮৪ সালে প্রথম রাঙ্গামাটি যাই। রাঙ্গামাটির আকাবাঁকা সড়ক, পাহাড় ও কাপ্তাই লেকের সেই নয়ানাভিরাম দৃশ্য এখনো মনে দাগ কেটে আছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও কৃত্রিম কাপ্তাই লেক দেশের মৎস্য খাত ও স্থানীয় মৎস্যজীবিদের জীবন জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
কাপ্তাই লেকের মোট আয়তন ৬৮,৮০০ হেক্টর ও দৈর্ঘ্য ৭৮ কিলোমিটার। কাপ্তাই লেকের মৎস্যসম্পদের ওপর ১৯৬৫-৬৬ সালে পরিচালিত প্রথম জরিপে লেকে রুই জাতীয় মাছের পরিমাণ ছিল মোট উৎপাদনের শতকরা ৮১ ভাগ এবং ছোট মাছের পরিমাণ ছিল শতকরা ৮ ভাগ। মাছের প্রজাতি সংখ্যা ছিল ৭২ টি।

সময়ের পরিক্রমায় কাপ্তাই লেক এখন অনেকটা বিবর্ণ, গভীরতা কমে লেকে চর পড়েছে, পানি হয়েছে খানিকটা দূষিত। আগে যেখানে লেকে মোট মৎস্যসম্পদের শতকরা ৮১ ভাগ ছিল রুই কাতলা জাতীয় মাছ এখন সে জায়গা দখল করে নিয়েছে ছোট মাছ, বিশেষ করে কাচকি, চাপিলা ও মলা।
সর্বশেষ ২০২৩-২৪ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের জরিপ অনুযায়ী লেকে কাচকি, চাপিলা ও মলার পরিমাণ শতকরা ৯০ ভাগ এবং রুই-কাতলা জাতীয় মাছ মাত্র শতকরা ০.৮ ভাগ। লেক থেকে ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে শিলং, দেশী সরপুঁটি, মোহিনী বাটা, মহাশোল, মধু পাবদা, দেশী পাঙ্গাস ও ফাইস্যা মাছ। সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে গণিয়া, খরশুলা, পোয়া, চ্যাং, বামস, ঘাউরা এবং বাঘাইর। লেকের মোট মৎস্য উৎপাদন ১৯২৫৩ মে. টন (২০২৩-২৪) অর্থাৎ হেক্টর প্রতি উৎপাদন ২৮০ কেজি যা অন্যান্য জলাশয়ের তুলনায় খুবই কম। এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাচকি জাতীয় ছোট মাছের আধিক্যতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আমাদের দেশীয় ছোট প্রজাতির মাছের মধ্যে কাচকি অন্যতম। কাচকির চোখ মাথার উপরিভাগে, দেহ লম্বাটে, রঙ অনেকটা স্বচ্ছ এবং পার্শ্বীয়ভাবে চাপা। গিল রেকার ১৯-২১ টি ও পেটে কিল বোন আছে। কাচকি মাছ লম্বায় সাধারনত ২-৩ সে. মিটার এবং সর্বোচ্চ ৬ সে. মিটার হয়ে থাকে। আকারে ৪ সে. মিটার হলেই এরা পরিপক্ষ হয়। স্ত্রী কাচকির ডিম ধারন ক্ষমতা ৪২০ হতে ৩২৪০টি।
কাচকির বৈজ্ঞানিক নাম Corica soborna (Hamilton, 1822) এবং ইংরেজী নাম Ganges river sprat | Clupeidae পরিবারের এই মাছটি বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ব্রুনাই, মালোয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার ও চীনে যায়। এই গণের আরেকটি প্রজাতি হচ্ছে C. laciniata (Fowler, 1935) যার ইংরেজী নাম হচ্ছে Bangkok river sprat. এই প্রজাতির গিল রেকারের সংখ্যা Corica soborna এর চেয়ে কম।
কাচকি মাছ জলাশয়ের পানির উপরিভাগে ঝাঁক বেঁধে চলাচল করে এবং ঝাঁকে পুরুষ কাচকির (৪৮%) চেয়ে স্ত্রী কাচকি (৫২%) বেশি থাকে। জলাশয়ে এরা জুপ্লাংটন এবং অমেরুদন্ডী অন্যান্য ক্ষুদ্রাকৃতির প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। শরৎকালে কাচকি মাছ বেশি ধরা পড়ে। পুষ্টি ও ঔষধিগুণ বিবেচনায় ছোট মাছের মধ্যে কাচকি অন্যতম। প্রতি ১০০ গ্রাম কাচকি মাছে ১২.৭ গ্রাম প্রোটিন, ৩.৬ গ্রাম ফ্যাট, ৪৭৬ মি. গ্রাম ক্যালসিয়াম ও ২.৮ মি. গ্রাম আয়রন থাকে। ভিটামিন এ এবং ডি, ফসফরাস, আয়োডিন ও আরজিনিন এর অন্যতম উৎস হচ্ছে কাচকি মাছ।
শিশুদের হাড় গঠনে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধে কাচকি মাছ অত্যন্ত কার্যকরী। সব বয়সী মানুষের জন্য এ মাছ উপকারী। পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচ দিয়ে মাখিয়ে রান্না করা কাচকি মাছের চচ্চড়ি বাঙ্গালীর একটি সুস্বাদু প্রিয় খাবার।
দেশের বিভিন্ন নদ-নদী, বিল ও লেকে কাচকি মাছ পাওয়া যায়। তবে উপকূলীয় জলাশয়েও কাচকি মাছ ধরা পড়ে। কাপ্তাই লেক, চলন বিল এবং হালতি বিলে এখন কাচকি মাছ বেশি ধরা পড়ে। কাপ্তাই লেকের কাচকি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করা হয়। কাপ্তাই লেকে কাচকি জাল/মশারি জাল দিয়ে কাচকি মাছ ধরা হয়। কাচকি জালের দৈর্ঘ্য ৩৭৫-২৭০০ ফুট ও প্রস্ত ৪২-৭৫ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে, জালের ফাঁস থাকে ২ মি. মিটার।








