ঈদের ছুটি মানেই কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস। পরিবার-পরিজন কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে কিছু আনন্দময় সময় কাটানোর সুযোগ। আর সেই সময়টুকু যদি ছোট্ট একটি ভ্রমণে রঙিন হয়ে ওঠে, তবে আনন্দ যেন পূর্ণতা পায়। প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে সাজানো ময়মনসিংহ হতে পারে এমনই একটি আদর্শ গন্তব্য।
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে গড়ে ওঠা এই ঐতিহ্যবাহী শহর একদিকে যেমন শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র, অন্যদিকে তেমনি ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব সমাহার। অল্প সময়ের ভ্রমণেই এখানে মিলবে ভিন্ন স্বাদের নানা অভিজ্ঞতা।
ময়মনসিংহ নগরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ শশী লজ। উনবিংশ শতকে মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর নির্মিত এই রাজপ্রাসাদ দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলী ও জমিদারি ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। বিশাল গম্বুজ, নান্দনিক বাগান, মার্বেল পাথরের ঘাট ও শ্বেতপাথরের ভাস্কর্য যেন দর্শনার্থীদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় অতীতের আভিজাত্যে। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত। ঐতিহ্যের খোঁজে শহরের বাইরে ঘুরে আসা যেতে পারে মুক্তাগাছার জমিদার বাড়িও।
ময়মনসিংহের প্রাণ বলা হয় ব্রহ্মপুত্র নদকে। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদী শুধু ভৌগোলিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, তার সৌন্দর্যও অনন্য। বিকেলের নরম বাতাস, নদীর ঢেউ আর নৌকার চলাচল-সব মিলিয়ে ব্রহ্মপুত্রের তীরে সময় কাটানো হয়ে ওঠে দারুণ প্রশান্তির।
নদের তীর ঘেঁষেই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন পার্ক। ফোয়ারা, দোলনা ও শিশুদের বিনোদনের নানা আয়োজনের কারণে এটি পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের অন্যতম পছন্দের স্থান। ঈদের ছুটিতে এখানে ভিড় জমে নানা বয়সী মানুষের।
সংস্কৃতিপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা। বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলার পথিকৃৎ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের দুর্ভিক্ষের চিত্রসহ অসংখ্য মূল্যবান শিল্পকর্ম এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। শিল্প ও ইতিহাসের প্রতি আগ্রহীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক অনন্য গন্তব্য।
নগরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত আলেকজান্ডার ক্যাসেল, যা ‘লোহার কুঠি’ নামেও পরিচিত, তার ব্যতিক্রমী নির্মাণশৈলীর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। কাঠ ও লোহার সমন্বয়ে নির্মিত এই ঐতিহাসিক ভবনে একসময় এসেছিলেন লর্ড কার্জন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে চমৎকার একটি গন্তব্য। প্রায় ১২০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই সবুজ ক্যাম্পাসে রয়েছে লেক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, গবেষণা কেন্দ্র ও ফসলের মাঠ। নিরিবিলি পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য এটি বেশ উপযোগী।
জেলার ফুলবাড়িয়ার সন্তোষপুর রাবার বাগান সবুজ বনাঞ্চল ও পাহাড়ি আবহের জন্য পরিচিত। শাল-গজারি বনের ছায়াঘেরা পথ আর বনের ভেতরে বানরের ছোটাছুটি ভ্রমণে এনে দেয় ভিন্ন মাত্রা।
ভালুকা উপজেলায় অবস্থিত দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কুমির খামার রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেডও পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। প্রায় আড়াই হাজার কুমির নিয়ে গড়ে ওঠা এই খামার ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক ব্যতিক্রম অভিজ্ঞতা। কাছেই রয়েছে গ্রীন অরণ্য পার্ক, যেখানে কৃত্রিম লেক, বোট রাইড, কিডস জোন ও রিসোর্ট সুবিধা পরিবারসহ ঘুরে বেড়ানোর আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
শহর থেকে অল্প দূরে ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা ময়নার চর এখন তরুণদের জনপ্রিয় আড্ডাস্থল। নিরিবিলি পরিবেশ, পাখির ডাক আর সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এই স্থানকে করে তুলেছে বিশেষ আকর্ষণীয়।





