উঁচু বট, পাকুড়, জাম কিংবা ডুমুর গাছের সবুজ পাতার আড়ালে নীরবে লুকিয়ে থাকে। হালকা বাতাসে ঝির ঝির শব্দে পাতাগুচ্ছ দুলতে থাকলে নজরে আসে রাঙা হলুদ পা আর তীক্ষ্ম নখ। তা থেকেই পর্যবেক্ষকরা অনুমান করেন পেছনে লুকিয়ে এক লাজুক পাখি। নাম তার হরিয়াল। যা প্রকৃতি ও পরিবেশের অকৃত্তিম বন্ধু এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষনের অনন্য প্রহরী।
হরিয়াল পায়রা পরিবারের ফলভূক্ত বৃক্ষচারি পাখি। ইংরেজি নাম‘ পিনটেইলড গ্রিন পিজিয়ন। তবে পায়রা থেকে এদের জীবনধারা ভিন্ন। সহজে মাটিতে নামেনা। জীবন কাটায় গাছের মগড়ালে। গাছের ফল, গুটি বা বীজ খেয়ে বাঁচে। গাছেই ঘুমায়, বাসা বেঁধে প্রজনন ঘটায় এবং ডালে বসে মন খুলে গান গায়। এরা গাছের বীজ মুখে পুরে বা উড়াল দেয়ার সময় জমিনে বিষ্ঠা ছড়িয়ে নতুন গাছ গজানোর সুযোগ করে দেয়। এজন্য বনবিদরা হরিয়ালকে বীজবাহক পাখি বলেছেন। আবার গাছের ডালে থাকাবস্থায় এরা শিকারির হাতে প্রান হারায়। তাই এদের পুরো জীবনচক্র গাছকে কেন্দ্র করে।
বাংলাদেশে মধুপুরের শালবন, সিলেট ও চট্রগ্রামের বন এমনকি গ্রামীন বনেও এদের দেখা মেলে। কিন্তু আশির দশক থেকে দেশি জাতের পরিবর্তে বিদেশী বনজ প্রজাতিতে সরকারি ও বেসরকারি বনায়ন হওয়ায় হরিয়ালের মতো ফলভূক পাখিরা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। খাদ্য, বাসস্থান, প্রজনন এবং নিরাপদে বসবাসের অধিকার হারায়।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব এর পাখি পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের তথ্য থেকে জানানো হয়, পাখি জরীপ ও বনাঞ্চল ভিত্তিক গবেষণায় দেশে হরিয়ালের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। হরিয়াল সুস্থ বনাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। বন উজাড়, অবৈধ শিকার এবং দেশি ফলদ গাছ কমে যাওয়ায় এরা সংখ্যায় কমছে বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু মধুপুর বনাঞ্চলের জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের ফরেষ্টার মোশারফ হোসেন ভিন্ন মত পোষণ করে জানান, শাল বনে এখনো প্রচুর হরিয়ালের দেখা মিলে। অবৈধ শিকারের সুযোগও এখানে কম।
সৌখিন পাখি পর্যবেক্ষক ও গবেষক ড. এ কে সাইমুম হাসান চৌধুরী জানান, এক সময়ে গ্রামের হাটবাজার, নদীতীর ও সড়কের মোড়ে বট-পাকুড় ও ডুমুরের দেখা মিলতো। এসব গাছের ফল হরিয়ালের খুবই প্রিয়। তিনি গবেষণা থেকে জানান, আজকাল গ্রামীন বনেও বাণিজ্যিকীকরণ স্পষ্ট। পাখি বান্ধব গাছ কেউ লাগায়না। প্রাকৃতিকভাবে গজিয়ে উঠলেও বেশ জায়গা দখল এবং ফসলহানির অজুহাতে তা উপড়িয়ে ফেলে। বাড়ির আঙ্গিনা বা আইলে দ্রুত বর্ধনশীল বিদেশি প্রজাতির বনজ গাছ লাগিয়ে অল্প দিনেই কাঠ ও লাকড়ি পাওয়ার হিসাব কষায় গ্রামীন বনের উদ্ভিদ ও প্রান বৈচিত্র্য পাল্টে যাচ্ছে। তাই হরিয়ালরাও সেখানে নিরাপদ নয়। হরিয়াল গাছের উঁচু ডালে ছোট আকারের বাসা বানায়। সাদা রংয়ের দুটি ডিম দেয়। স্ত্রী-পুরুষ মিলিয়ে তা দিয়ে তিন সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা ফুটায়।
অবসরপ্রাপ্ত বনকর্মী নজরুল ইসলাম জানান, প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য শুধু বন রক্ষাই যথেষ্ট নয়; বরং বন সমৃদ্ধ করার নীরব যোদ্ধা হরিয়ালের মতো পাখিদের বাঁচার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরী।
তিনি আরো বলেন, গ্রামীন ও সরকারি বনে যদি হরিয়ালের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত না হয়, তাহলে জীববৈচিত্র্য ও প্রান-প্রকৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ ব্যার্থ হবে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সৌখিন ফটোগ্রাফার কামাল হোসেন বলেন, ইটভাটার জ্বালানী হিসাবে গ্রামীন জনপদের বট-পাকুড়-ডুমুর গাছ কেট ফেলা হচ্ছে। অথচ এসব ফল হরিয়ালের খুব প্রিয় খাবার। তাছাড়া এসব গাছেই দলবদ্ধ হয়ে তারা জীবন কাটায়। কিন্তু সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এসব গাছ লাগানো হচ্ছেনা। ফলে দৃষ্টিনন্দন ও প্রকৃতি বান্ধব হরিয়ালরা না পাচ্ছে পর্যাপ্ত খাবার, না পাচ্ছে প্রজনন করার মৌলিক অধিকার।







