মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে ভারতে নির্বাসনে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে|
রয়টার্স লিখেছে, বৃহস্পতিবার রাতে টেলিফোনে দেওয়া প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, শুধু তিনি একাই নন, নির্বাসিত জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতারাও তাঁর সঙ্গে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন|
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে সরাসরি সাক্ষাৎকার দিলেন ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা| এর আগে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমের লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিলেও সাক্ষাৎকার দেননি| তবে ইমেইলে ভারতের এনডিটিভিকে দেওয়ার সাক্ষাৎকারে এ বছরই দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা| রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এবার সুনির্দিষ্ট সময়ের আভাস দিয়েছেন|
বাংলাদেশে এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ, দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেও ফাঁসির আসামি| আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এএফএম বাহাউদ্দিন নাছিম জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ একটি ‘বৃহৎ সমাবেশ’ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে| তিনি বলেছিলেন, নেত্রীর প্রত্যাবর্তন হবে ‘বীরোচিতভাবে’| দলীয় অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো তখন জানিয়েছিল, কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল হওয়ায় শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ভ্রমণ অনুমতিপত্র নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন|
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকির কথা স্বীকার করেছেন| তিনি বলেন, ‘ফিরলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে| তবুও আমাকে যেতে হবে|’ সব ঝুঁকি সত্ত্বেও নিজের বাবা-মায়ের কবর যেখানে রয়েছে, সেই দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষার কথা জানান তিনি|
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশত্যাগের বিষয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, কারণ ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সময় জনতা তার বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসায় তার জীবনের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছিল| বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়কে ‘প্রহসন’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি| ‘দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করলে জনগণের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হবে| কারাবরণ নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই’- বলেন তিনি|
১৯৮১ ও ২০০৭ সালে গ্রেপ্তারের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা| জানান, আইনি চাপের মধ্যেও কখন বা কীভাবে দেশে ফিরবেন- এ বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে তিনি পরামর্শ করেননি| আওয়ামী লীগ সভাপতির দেশে ফেরার সম্ভাবনাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখছে বিএনপি সরকার| সরকারের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এটি একটি বিপজ্জনক ‘রাজনৈতিক ফাঁদ’, যার উদ্দেশ্য কেবল দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা|
তার ভাষ্য, ‘আমার দলের নেতা-কর্মীরা চরম নিপীড়নের শিকার হচ্ছে| যদি মৃত্যু আসে, আমি চাই তা আমার নিজের দেশের মাটিতেই আসুক, যেখানে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন, যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে|’
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমাতে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেয়|
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই আন্দোলনে প্রায় ১৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল| তবে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন|
ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে| ঢাকা বারবার তাকে দেশে ফেরত পাঠাতে নয়াদিল্লির প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে| এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়, আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতকে চিঠি দিচ্ছে| তবে আমি নিজেই যাব|’
রয়টার্স লিখেছে, শেখ হাসিনার এই প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিভক্তি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন বর্তমান বিএনপি সরকার দুই বছরের অস্থিরতা কাটিয়ে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে| আবার শেখ হাসিনা ফিরলে তা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বরফ গলাতেও সাহায্য করতে পারে|
প্রতিবেদনে রয়টার্স বলেছে, শেখ হাসিনার এই মন্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি| শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন| “আমি সবাইকে বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরব| তোমাদেরও একদিন ফিরতে হবে| সবাই মিলে আমরা আদালতে আত্মসমর্পণ করব|” তবে কবে দেশে ফিরবেন বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ সাক্ষাৎকারে বলেননি শেখ হাসিনা| তিনি বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি| আমার মনে হয়, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেই মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক—আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই|’
সাক্ষাৎকারে হাসিনা দাবি করেন, দেশে ফেরার বিষয়ে ঢাকা বা অন্য কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে তিনি কোনো আলোচনা করেননি| ‘গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার কোনো গোপন আলোচনার বিষয় নয়|’
কারাগারে যেতে হলে তা নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই দাবি করে ক্ষমতাচ্যুত এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর আগেও তাকে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল| ১৯৮১ সালে নির্বাসন থেকে ফেরার পর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে এবং ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও দুর্নীতির অভিযোগে তাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল|
টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পর কেন দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন, সে বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট তার বাসভবনের দিকে যখন জনতা এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন জীবন শঙ্কা থেকেই তিনি দেশ ছাড়েন| তিনি বলেন, ‘যখন কোনো সরকার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, তখন ভুল হতেই পারে, কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়| তবে একটি সরকারের ভালো-মন্দ বা ঠিক-বেঠিক বিচার করার অধিকার জনগণের| আমি সেই বিচারের ভার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি|’
দেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দল পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করার কথা বলেছেন শেখ হাসিনা|
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তারা হয়ত আমাকে সাজা দিয়েছে এবং আমি হয়ত নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না| কিন্তু তারা আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করবে? আমরা যদি খারাপ কিছু করে থাকি, তবে জনগণকে সেটা সিদ্ধান্ত নিতে দিন|’
শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে ভারতে অবস্থান করছেন| তবে তার বা দলের অন্য নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি রয়টার্স|
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা একটি ‘পরিকল্পিত কৌশল’, যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনরায় সক্রিয় করা এবং রাজপথে বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে| বিএনপির নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, সম্ভাব্য আপিলের পরও যদি সুপ্রিম কোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে, তাহলে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ‘নৈরাজ্য’ তৈরি হতে পারে|
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা এই নেত্রীর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বর্তমান সরকারের স্থিতিশীলতার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে| একই সঙ্গে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে বিদ্যমান টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়তে পারে|
বাংলাদেশ বারবার শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছে| তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিষয়টি তারা পর্যালোচনা করছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ|
সূত্র : রয়টার্স|





