জননিরাপত্তা নিশ্চিতে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় র্যাবকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, একটি নতুন আইন প্রণয়নের কাজ চলছে, যার মাধ্যমে এই বাহিনীর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কাজের পরিধি সুনির্দিষ্ট করা হবে। তিনি বলেন, ‘র্যাবের কিছু কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের কারণে বাহিনীটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাও এসেছে|’
সোমবার (১৮ মে) দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন সদরদফতরে বাহিনীটির ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন| সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কোনো কর্মকর্তা অপরাধ করলে সেটি তার ব্যক্তিগত দায়, পুরো বাহিনীর নয়| যারা অপরাধ করেছে তাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে|’ তিনি বলেন, ‘বিগত সরকার র্যাবকে দলীয় কাজে ব্যবহার করেছে| আমরা চিন্তা করছি, নতুন কোনো এলিট ফোর্স গঠন করা যায় কি না, অথবা র্যাবকে পরিবর্তন করা যায় কি না| প্রয়োজনে দেশ র্যাবকে নতুন রূপে দেখতে পাবে|’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, র্যাবের কাঠামো বা নাম পরিবর্তন করা হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাহিনীটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও সরকার মনে করছে| র্যাব থাকছে কি থাকছে না এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নতুন আইনে ‘নতুন একটি এলিট ফোর্স গঠনের’ প্রক্রিয়ায় রয়েছে সরকার| তবে এর নাম 'র্য্যব' থাকবে কী না সে বিষয়েও এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী|
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "বর্তমানে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের একটি আইনে র্যাব পরিচালিত হচ্ছে| এটা এডহক ভিত্তিতে চলেছে| একটা প্রতিষ্ঠান এভাবে পরিচালিত হওয়া সঠিক ছিল না| “এখন আমরা একটা আইন করবো আলাদা এলিট ফোর্সের জন্য, এখানে অথরিটি দেওয়া থাকবে, তাদের রেসপন্সিবিলিটি সুনির্দিষ্ট করা থাকবে এবং সেটার ভিত্তিতে তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে| এটা এখনো ডিটেইল বলার সময় আসেনি|”
ক্ষমতার পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এলিট ফোর্স হিসেবে নতুন কিছু গড়ে তোলা সম্ভব হলে, নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র পুর্নবিবেচনা করবে বলে বিশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর| "আমেরিকা যখন র্যাবের এর ওপর স্যাংশন দিয়েছিল তখন র্যাব এমন কিছু কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল...রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল| সেই সময় ফ্যাসিবাদী সরকারের যারা দণ্ডমুণ্ডের কর্তা শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য, এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য এই জাতীয় অনেক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে| র্যাবের উপর আমেরিকার স্যাংশনটা এখনো বহাল| কিন্তু আমরা যদি এলিট ফোর্স হিসেবে একটা নতুন ফোর্স রিনেম করি বা রেইজ করি সেখানে হয়তো তারা বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করবেন| সেটা আশা করা যায়, তবে এখনো অনেক কিছু বাকি আছে..দেখা যাক|"
র্যাবকে ফের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে কী না প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "মর্নিং শোজ দ্য ডে| তিন মাস হয়ে গেল| এর মধ্যে পুলিশ কি ব্যবহৃত হয়েছে? র্যাব কী ব্যবহৃত হয়েছে, পলিটিক্যাল উদ্দেশে অন্য কোনো বাহিনী কী ব্যবহৃত হয়েছে? সুতরাং মর্নিং সৌজ দা ডে|"
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের সময়ে জঙ্গিবাদের উত্থান ও আইনশৃঙ্খলার ক্রমাগত অবনতির মধ্যে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, আনসার ও ভিডিপি, বিজিবি ও কোস্ট গার্ড সদস্যদের নিয়ে র্যাব গঠিত হয়| পরে ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে শতশত বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে| বিএনপির পর আওয়ামী লীগের সময়ও এর ধারাবাহিকতা দেখা যায়|
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একাধিকবার র্যাব ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানালেও বাংলাদেশ সরকার তাতে সাড়া দেয়নি| এমনকি যিনি ক্ষমতায় থাকতে র্যাব গঠিত হয়েছিল, সেই খালেদা জিয়াও পরে আওয়ামী লীগ আমলে র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছিলেন|
২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে র্যাব এবং এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার| এরপর র্যাবের ‘ক্রসফায়ার’ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়|
সবশেষ ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ু ওএইচসিএইচআর র্যাব বিলুপ্তির পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) কেবল সীমান্তরক্ষা এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা পরিদপ্তরকে কেবল সামরিক গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুপারিশ করে| সেসব আহ্বানে সাড়া না দিয়ে র্যাব গঠনের ২২ বছর পর মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে সরকার|
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান বা র্যাবের নতুন নাম হবে স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স বা এসআইএফ|








