বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের জোয়ারে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এক অভূতপূর্ব নীরব বিপ্লব শুরু হয়েছে। পশুর চামড়া ব্যবহার নিয়ে বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান নৈতিক বিতর্ক এবং কৃত্রিম বা সিনথেটিক চামড়ার মারাত্মক পরিবেশগত ক্ষতির প্রেক্ষাপটে গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই খুঁজছিলেন সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প। আর এই অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে এবার উঠে এসেছে বাংলাদেশের জাতীয় ফল ‘কাঁঠাল’।
এক সময় যা কেবলই আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া হতো, সেই কাঁঠালের খোসা, বোঁটা ও ভেতরের আঁশ থেকে এখন তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের উন্নত উদ্ভিজ্জ চামড়া বা ‘ভেগান লেদার’ (Vegan Leather)। বিশ্বখ্যাত গবেষক ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো প্রমাণ করেছে যে, কাঁঠালের বর্জ্য ব্যবহার করে সফলভাবে পরিবেশবান্ধব চামড়া তৈরি সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্লাস্টিক ও পশুর চামড়ার শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামনে এই চামড়া শিল্প এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর উৎপাদিত লাখ লাখ টন কাঁঠালের প্রায় ৬০ শতাংশই বর্জ্য হিসেবে অবহেলিত থাকে। এই বিশাল পরিমাণ বর্জ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ‘সবুজ সোনা’ বা গ্রিন গোল্ডে রূপান্তর করা সম্ভব।
যদি সঠিক উপায়ে এই নতুন বায়োপলিমার প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ করা যায়, তবে আগামী এক দশকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্পের পাশাপাশি এই ‘ভেগান লেদার’ খাত বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় এনে দিতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বাংলাদেশ ভ্যালু চেইন ডিজাইন রিপোর্টের তথ্যমতে, এই ফেলে দেওয়া অংশ থেকেই এখন বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে উচ্চমানের বায়োপলিমার লেদার, যা দেখতে হুবহু পশুর চামড়ার মতোই মসৃণ, দীর্ঘস্থায়ী ও ফ্লেক্সিবল বা নমনীয়।

কাঁঠাল থেকে চামড়া তৈরির বৈজ্ঞানিক প্রসেস বা উৎপাদন প্রক্রিয়া
কাঁঠাল থেকে বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতের উপযোগী চামড়া তৈরির প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও রাসায়নিক দূষণমুক্ত। আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক গবেষণা এবং ফিলিপাইনের বিখ্যাত ‘লংকা তুলদ (LANGKAtulad)’ পরিবেশ প্রজেক্টের (২০২৫) কার্যপ্রণালি সূত্র ধরে কাঁঠাল থেকে ভেগান লেদার তৈরির প্রধান ধাপগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. বর্জ্য সংগ্রহ ও বাছাইকরণ: প্রথমে মাঠ পর্যায় বা প্রসেসিং প্ল্যান্ট থেকে কাঁঠালের পরিত্যক্ত অংশ যেমন- বাইরের কাঁটাযুক্ত খোসা, বোঁটা ও ভেতরের অতিরিক্ত আঁশ সংগ্রহ করা হয়। এরপর এগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত করা হয়।
২. তন্তু নিষ্কাশন: পরিষ্কার করা খোসা ও আঁশগুলোকে বিশেষ হাইড্রোলিক ক্রাশার মেশিনে দিয়ে টুকরো বা পেস্ট করা হয়। এরপর রাসায়নিক বা এনজাইমেটিক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে তা থেকে লিগনোসেলুলোজিক ফাইবার আলাদা করা হয়।
৩. বায়োপলিমার মিশ্রণ: এই প্রাকৃতিক তন্তুর স্থায়িত্ব ও জলপ্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এর সাথে প্রাকৃতিক রেজিন, উদ্ভিজ্জ মোম ও পরিবেশবান্ধব পলিমার যেমন- পলিভিনাইল অ্যালকোহল মিশ্রিত করা হয়। এই পর্যায়টিকে ‘বায়োমিমেটিক মেটেরিয়াল ডিজাইন’ বলা হয়, যা সাধারণ উদ্ভিদ তন্তুকে চামড়ার মতো টেক্সচার দেয়।





