গত রাত থেকে টানা সাড়ে আট ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিতে ময়মনসিংহ নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারন করেছে| সকাল দশটার দিকে নগরীর ব্রাহ্মপল্লী এলাকায় নানারবাড়িতে আট মাসের এক শিশু বসতঘরে জমে থাকা পানিতে ডুবে মারা গেছে| শিশুর ফুফু জানান, বৃষ্টির সময় শিশু আয়াশকে নিয়ে তার মা শুয়ে ছিল| মা ঘুমে থাকাবস্থায় শিশুটি গড়িয়ে বিছানা থেকে পড়ে পানিতে ডুবে যায়| এতেই শিশুটির মৃত্যু হয়| আয়াশ সেহড়া মুন্সীবাড়ি এলাকার আবিদ ও বন্যা দম্পতির ছেলে| খবর পেয়ে সিটি প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং শিশুটির পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান|

এদিকে বৃষ্টির পানি জমে একাধিক প্রধান সড়ক, অলিগলি, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়| জলাবদ্ধতার কারণে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়| প্রবল বর্ষণের কারণে নগরীর গাঙ্গিনারপাড়, নতুনবাজার, জেলাস্কুল মোড়, চরপাড়া, সানকিপাড়া, আকুয়া, গোলকিবাড়ী, পুরোহিতপাড়া, বলাশপুর কেওয়াটখালীসহ অনেক এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়| বহু বাসাবাড়িতে মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে| অনেকের বসতঘরে পানি উঠায় ভোগান্তি চরমে পৌছে| সেহড়া মুন্সীবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে বসতঘরে পানি জমে থাকায় রান্না করতে না পারায় হোটেল থেকে খাবার এনে পরিবার নিয়ে খেয়েছেন| সানকিপাড়ার মিন্টু বলেন, ‘বাসায় পানি জমে থাকায় রান্না করা যায়নি| বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনতে হয়েছে|

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) আবহাওয়া অধিদপ্তরের ইনচার্জ জানান, রাত সাড়ে ১২টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত সাড়ে আট ঘণ্টায় ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে| এ বছরের মধ্যে আজই ময়মনসিংহ জেলার সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড|
সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকার ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, নির্মাণাধীণ বহুতল ভবনের অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খালদখল এবং চলমান উন্নয়নকাজের কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারছে না| সামান্য ভারি বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা পানি জমে যায়| এজন্য প্রতি বর্ষা মৌসুমেই নগরবাসীর দুর্ভোগ পোহাতে হয়| একই এলাকার হেলথ অফিসার গলির হামিদা আক্তার বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে এবং ড্রেন পরিষ্কার না থাকায় বাসায় পানি ঢুকে আসবাবপত্র ভিজে গেছে|

চরপাড়া মোড় এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগী নিয়ে এসে ভোগান্তিতে পড়েন জামালপুরের আবুল বাশার| তিনি বলেন, রাস্তায় হাঁটুপানির কারণে কয়েকশ মিটার রাস্তা অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে যেতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে| হাসপাতালেও পানি উঠায় আমার মতো অনেকেই ভোগান্তিতে পড়েছেন|
সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, শুধু অস্থায়ীভাবে পানি অপসারণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, খাল পুনরুদ্ধার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে| শহরের অনেক জায়গায় ড্রেনের মাঝখানে বিদ্যুতের খুঁটি থাকায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে| ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই মানুষের বাসাবাড়িতে পানি উঠে ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে|

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি ইয়াজদানী কোরাইশী কাজল বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন করতে হলে পরিকল্পিতভাবে ড্রেন খনন জরুরি হয়ে পড়েছে| পানি নিস্কাষণ ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত নগরবাসী সুফল পাবে না|
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, ‘ভারি বৃষ্টির কারণে নগরীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও ড্রেন ও খাল খনন করে পরিস্কার করায় দ্রুত পানি নামছে| সকাল থেকে আমি বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছি এবং নিজে জলাবদ্ধতা নিরসনে মাঠে কাজ করছি| মূলত অলিগলিতে পানি জমে আছে| এর কারণ হচ্ছে বহুতল ভবনের মালিকগণ অপরিকল্পিতভাবে ড্রেনে ময়লা আবর্জনা ফেলে এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে|’ বিষয়টি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি|

সড়ক উন্নয়ন ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্কসহ নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণ প্রকল্পের আওতায় ২০২১ থেকে ২০২৫ এই পাঁচ অর্থবছরে ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীতে ৩২২ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ কাজ শুরু হয়| তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও মাত্র ৫৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে|





