৭২ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল সুইজারল্যান্ড। ১২০ মিনিটের লড়াইয়ের সব রোমাঞ্চ গিয়ে যেন জমা হলো টাইব্রেকারে।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট পেরিয়ে অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও দুই দলের আক্রমণে ধার ফিরল না। একরকম উত্তাপহীন লড়াইয়ের সব রোমাঞ্চ গিয়ে যেন জমা হলো টাইব্রেকারে। যেখানে স্নায়ুচাপ ধরে রেখে, কলম্বিয়াকে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালের টিকেট কাটল সুইজারল্যান্ড।
ভ্যানকুভারে বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরে শেষ হওয়া ম্যাচে পেনাল্টি শুটআউটে ৪-৩ গোলে জিতেছে সুইজারল্যান্ড। নির্ধারিত সময় ছিল গোলশূন্য ড্র। ১২০ মিনিটেও আসেনি ফল। এর আগে সুযোগ এসেছে, হাতছাড়াও হয়েছে।

কখনো গোলরক্ষকের সেভ, কখনো ক্রসবার, ভ্যাঙ্কুভারের দীর্ঘ রাত যেন গোলের জন্য অপেক্ষা করেই কাটল। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে স্নায়ুচাপ সামলে কলম্বিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল সুইজারল্যান্ড। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা।
শেষ ষোলোর ম্যাচে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে কলম্বিয়াকে ৪-৩ গোলে হারিয়েছে সুইসরা।
কলম্বিয়ার কুচো হার্নান্দেসের পেনাল্টি ঠেকিয়ে নায়ক হয়ে ওঠেন গ্রেগর কোবেল। এরপর শেষ শটে রুবেন ভার্গাস গোল করতেই শেষ আটের টিকিট নিশ্চিত হয় সুইজারল্যান্ডের।
কলম্বিয়ার কুচো হার্নান্দেসের পেনাল্টি ঠেকিয়ে নায়ক হয়ে ওঠেন গ্রেগর কোবেল। এরপর শেষ শটে রুবেন ভার্গাস গোল করতেই শেষ আটের টিকিট নিশ্চিত হয় সুইজারল্যান্ডের।
দুই দলই শুরু থেকে সতর্ক ছিল। তবে ম্যাচের প্রথম ভাগে কলম্বিয়ার প্রেসিং ছিল চোখে পড়ার মতো। দ্বিতীয় মিনিটেই সুইস গোলরক্ষক কোবেলকে চাপে ফেলে ভুল ক্লিয়ারেন্সে বাধ্য করেন লুইস সুয়ারেস।
ষষ্ঠ মিনিটে প্রথম শট লক্ষ্যে রাখে সুইজারল্যান্ড। বাম দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে শট নেন দান এনডয়ে, তবে তা সহজেই ধরে ফেলেন কলম্বিয়া গোলরক্ষক কামিলো ভার্গাস। যদিও আক্রমণের পরপরই অফসাইডের পতাকা ওঠে।

১২তম মিনিটে বিপজ্জনক জায়গায় ফ্রি-কিক পায় কলম্বিয়া। লুইস দিয়াসকে ফাউল করা হলে জেমস রদ্রিগেস দারুণ ডেলিভারি দেন বক্সে। জন লুকুমি বলের নাগাল পাওয়ার আগেই গুরুত্বপূর্ণ হেডে বিপদ সরিয়ে দেন সুইস অধিনায়ক গ্রানিত জাকা।
২০তম মিনিটে এগিয়ে যাওয়ার দারুণ সুযোগ পায় কলম্বিয়া। আক্রমণভাগে সুন্দর বোঝাপড়ার পর বক্সের বাইরে বল পান গুস্তাভো পুয়ের্তা। তার বাঁকানো শট টপ কর্নারে ঢুকে যাওয়ার মতোই ছিল। কিন্তু দারুণ ঝাঁপিয়ে বল ঠেকিয়ে দেন কোবেল।
হাইড্রেশন ব্রেকের আগে পর্যন্ত কলম্বিয়া তুলনামূলক ইতিবাচক ছিল। তবে বিরতির পর গতিপথ কিছুটা পাল্টায় সুইজারল্যান্ড। ৩১তম মিনিটে এক মিনিটের মধ্যেই দুটি বড় সুযোগ তৈরি করে তারা। প্রথমে ফ্যাবিয়ান রিডারের বাঁ পায়ের শট ঠেকান ভার্গাস। এরপর প্রায় একই জায়গা থেকে এনডয়ের নিচু শটও ভালোভাবে ধরে ফেলেন কলম্বিয়া গোলরক্ষক।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে ম্যাচে কিছুটা গতি আসে। ৩৯তম মিনিটে বক্সে ভেসে আসা বলে দুর্দান্ত বাইসাইকেল কিকের চেষ্টা করেন লুইস দিয়াস। তবে ডেনিস জাকারিয়া সামনে এসে মাথা ছুঁইয়ে বিপদ সরান।
বিরতিতে গোলশূন্য অবস্থাতেই মাঠ ছাড়ে দুই দল। খুব বেশি পরিষ্কার সুযোগ তৈরি না হলেও দুই গোলরক্ষককেই গুরুত্বপূর্ণ সেভ করতে হয়।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মাঝমাঠে পরিবর্তন আনে সুইজারল্যান্ড। আর্দন জাশারির জায়গায় নামেন জিব্রিল সো। নেমেই বড় সুযোগ পান তিনি। বাম দিক থেকে এনডয়ের নিচু ক্রস বক্সে ফাঁকায় পেয়ে শট নিতে গিয়ে পিছলে যান সো; বল চলে যায় পোস্টের বাইরে।
৪৯তম মিনিটে পেনাল্টির দাবি করে সুইজারল্যান্ড। ডানিয়েল মুনিয়োসকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে পড়ে যান এনডয়ে। তবে রেফারি সাড়া দেননি, রিপ্লেতেও তেমন কোনো স্পষ্ট সংস্পর্শ দেখা যায়নি।
৫১তম মিনিটে হলুদ কার্ড দেখেন জাকা। মুনিয়োসের পায়ে পা দিয়ে ফেলায় বুকিং পান সুইস অধিনায়ক। দুই মিনিট পর ফ্রি-কিক থেকে চেষ্টা করেন রিডার। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে তার বাঁকানো শট পোস্টের পাশের জালে লাগে।
এরপর ম্যাচে বাড়তে থাকে শারীরিক লড়াই। ৫৯তম মিনিটে লুইস দিয়াসকে দেরিতে ট্যাকল করে হলুদ কার্ড দেখেন জাকারিয়া। পরের মিনিটে কোবেলকে ধরে রাখায় বুকিং পান কলম্বিয়ার লুইস সুয়ারেস।
৬৩তম মিনিটে সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি সুয়ারেস। জাকার কাছ থেকে বল কেড়ে বক্সের বাইরে ফাঁকা জায়গায় শটের সুযোগ পান তিনি। কিন্তু তার প্রচেষ্টা এতটাই লক্ষ্যভ্রষ্ট ছিল যে প্রায় থ্রো-ইনের দিকে চলে যায়।
৬৬তম মিনিটে বড় পরিবর্তন আনে কলম্বিয়া। জেমস রদ্রিগেসের বদলে নামেন হুয়ান কুইন্তেরো, জন আরিয়াসের জায়গায় আসেন জামিন্তন কাম্পাস। একই সময়ে ম্যাচের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করলেও গোলের মুখ খুলতে পারেনি কোনো দল।
শেষ ১৫ মিনিটে দুই দলই আক্রমণে ধার হারায়। ৭৭তম মিনিটের দিকে সুইজারল্যান্ডের সর্বশেষ অন টার্গেট শটের পর প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেলেও তারা আর প্রতিপক্ষ গোলরক্ষককে পরীক্ষা করতে পারেনি।
৮২তম মিনিটে আরও দুই পরিবর্তন আনে কলম্বিয়া। জেফারসন লেরমা ও লুইস সুয়ারেসের বদলে নামেন রিচার্ড রিওস ও কুচো হার্নান্দেস। ৮৬তম মিনিটে সুইজারল্যান্ড তুলে নেয় ব্রিল এমবোলো ও জাকারিয়াকে; নামেন সেদ্রিক ইত্তেন ও সিলভান ভিডমার।

৮৮তম মিনিটে পেনাল্টির আবেদন করে কলম্বিয়া। লুইস দিয়াসের দারুণ ক্রসে ব্যাক পোস্টে বলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েন কাম্পাস। তিনি পড়ে গেলে কলম্বিয়ানরা পেনাল্টি দাবি করলেও রেফারি তা নাকচ করেন। রিপ্লেতে সংস্পর্শ ছিল খুবই সামান্য।
৯০+১ মিনিটে নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ জেতার সেরা সুযোগ পায় সুইজারল্যান্ড। দাভিনসন সানচেসের পেছন থেকে দৌড়ে বক্সে ঢুকে পাস পান এনডয়ে। কিন্তু নিচু শটে বল পোস্টের বাইরে পাঠান তিনি। গোলশূন্য ৯০ মিনিটের পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই পেনাল্টির দাবি করে কলম্বিয়া। ৯৪তম মিনিটে বক্সে আলগা বলে টাচ নিয়ে মিরো মুহেইমকে কাটিয়ে পড়ে যান কাম্পাস। কলম্বিয়ার খেলোয়াড়রা পেনাল্টির জন্য জোর দাবি তুললেও রেফারি দেননি, ভিএআরও সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
৯৯তম মিনিটে গোলের সবচেয়ে কাছে যায় কলম্বিয়া। কুইন্তেরোর দারুণ কর্নারে লাফিয়ে হেড নেন লুকুমি। কিন্তু তার জোরাল প্রচেষ্টা ক্রসবারে লেগে বাইরে চলে যায়।
দুই মিনিট পর দূরপাল্লার শটে চেষ্টা করেন কাম্পাস। প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে তার জোরাল প্রচেষ্টায় কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লেও নিজের ফোরআর্ম দিয়ে বল সামলে নেন কোবেল।
১০৩তম মিনিটে সুইজারল্যান্ডের হয়ে নামেন জেকি আমদুনি। নেমেই প্রায় গোল পেয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। প্রথম টাচে দুই কলম্বিয়ান ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলে জোরাল শট নেন, তবে সেটি ঠেকিয়ে দেন ভার্গাস।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে দুই দলই আক্রমণে প্রাণ ফেরালেও গোল আসেনি। শেষ ১৫ মিনিটে আবার সতর্ক হয়ে পড়ে দুই দল। ১১৩তম মিনিটে বক্সের বাইরে ফাঁকায় বল পেয়ে শট নেন জাকা, কিন্তু তাড়াহুড়োয় বল পাঠান ক্রসবারের ওপর দিয়ে।
১১৫তম মিনিটে বিশাল সুযোগ নষ্ট করেন কাম্পাস। জাকার ভুল পাস সরাসরি পেয়ে বক্সে ঢুকে শট নেন তিনি, কিন্তু লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। ১১৮তম মিনিটে চোট নিয়ে মাঠ ছাড়েন লুকুমি; তার বদলে নামেন ইয়েরি মিনা।
১২০ মিনিট শেষে গোলশূন্য থাকায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। বিশ্বকাপের পেনাল্টি শুটআউটে আগে কখনো জয় পায়নি দুই দলের কেউই। তাই ভ্যাঙ্কুভারের রাত তখন স্নায়ুচাপের পরীক্ষায় রূপ নেয়।
প্রথম শটে কলম্বিয়াকে এগিয়ে দেন কুইন্তেরো। সুইজারল্যান্ডের হয়ে জবাব দেন জাকা। পরের শটে দাভিনসন সানচেস জোরে মাঝ বরাবর মারতে গিয়ে বল লাগান ক্রসবারে।
এরপর আমদুনি গোল করে সুইজারল্যান্ডকে এগিয়ে দেন। কাম্পাসের শট কোবেলের শরীরের নিচ দিয়ে জালে ঢুকলে ২-২ হয় স্কোর। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের মানুয়েল আকানজি নিজের শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দিলে আবার ম্যাচে ফেরে কলম্বিয়া।
তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি তারা। কুচো হার্নান্দেসের ভালো পেনাল্টি কোণেই যাচ্ছিল, কিন্তু দুর্দান্ত সেভে হাত লাগিয়ে সেটি ঠেকান কোবেল। এরপর সেদ্রিক ইত্তেন সোজা মাঝ বরাবর শট মেরে সুইজারল্যান্ডকে ৩-২ এগিয়ে দেন।
লুইস দিয়াস ঠান্ডা মাথায় গোল করে কলম্বিয়াকে টিকিয়ে রাখেন। কিন্তু শেষ শটে রুবেন ভার্গাস কোনো ভুল করেননি। তার গোলেই ৪-৩ ব্যবধানে শুটআউট জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখে সুইজারল্যান্ড।




