ঘরভর্তি ময়লা-আবর্জনা, স্যাঁতসেতে মেঝেতে জন্মেছে ছত্রাক। এর মধ্যেই ছোট একটি খাটের ওপর পড়ে ছিল সত্তরোর্ধ্ব এক প্রবীণ নারীর নিথর দেহ। নাম নূরজাহান বেগম। তিনি কবে মারা গেছেন, বলতে পারেন না সন্তানরা।
ঘটনাটি ঢাকার মিরপুরের। খবর পেয়ে গত রোববার ওই বাসা থেকে পুলিশের সদস্যরা যখন ওই বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার করেন, ততক্ষণে তাতে পচন ধরে রীতিমত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: হাসান বাসির বলেন, ‘ফ্ল্যাটটি এত পরিমাণে নোংরা এবং সেখান থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল যে, পুলিশের সদস্যরা দাঁড়াতে পারছিল না।
পুলিশ বলছে, ওই বৃদ্ধার সন্তানরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত। ওসি বলেন, ‘উনার ছেলেদের মধ্যে একজন যুগ্ম সচিব, আরেকজন বুয়েটের শিক্ষক। এছাড়া উনার একটা মেয়ে আছে, যিনি স্থানীয় একটা স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ওই মেয়ের সাথেই তিনি থাকতেন।’
স্যাঁতসেতে নোংরা যে ঘরটিতে বৃদ্ধা নূরজাহান বেগম মারা গেছেন, ইতোমধ্যেই সেটির ছবি এবং ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
সেগুলো দেখার পর অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অবহেলার অভিযোগ তুলে সন্তানদের শাস্তিও দাবি করছেন কেউ কেউ। বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদনও দায়ের করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো: আব্দুল বারী জানিয়েছেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়াত বৃদ্ধার যুগ্ম-সচিব ছেলের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন তারা।
ইতোমধ্যে বুধবার ওই যুগ্মসচিবকে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
কিন্তু বয়স্ক মা-বাবার দেখা-শোনার ব্যাপারে বাংলাদেশের আইনে ঠিক কী বলা আছে? কোনো সন্তান যদি ওই আইন না মানেন, সেক্ষেত্রে তাকে কী ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে?
প্রাথমিক তদন্তে যা পেয়েছে পুলিশ
মিরপুর ছয় নম্বর সেকশনের চতুর্থ তলার যে ফ্ল্যাটটি থেকে নূরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি সি ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কে অবস্থিত। বাসাটি মূলত বৃদ্ধার মেয়ে ও তার স্বামীর বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ।
ওসি বাসির বলেন, ‘উনার মেয়ের জামাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান। তাদের ছেলে-মেয়ে নেই। ফলে ঘরে মানুষ বলতে কেবল মা-মেয়ে দু’জনই ছিলেন।’
ভবনের অন্য বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস করলেও তারা খুব একটা বাইরে বের হতেন না। ‘তারা কারো সাথে কথা বলত না, খুব একটা মিশত না। কোনো প্রয়োজনে বাসায় গেলে দরজাও খুলত না,’ বলছিলেন ভবনটির এক বাসিন্দা।
গত রোববার মায়ের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পাশের একটি ক্লিনিক থেকে দু’জন নার্সকে বাসায় ডেকে আনেন বৃদ্ধার চল্লিশোর্ধ স্কুল শিক্ষক মেয়ে।
ওসি বাসির বলেন, ‘তারা ঘরে ঢুকে বৃদ্ধাকে মরে পড়ে থাকতে দেখে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে খবরটা আমাদের জানান।’
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশের সদস্য নিশ্চিত হন যে বৃদ্ধার মৃত্যু বেশ কয়েকদিন আগেই হয়েছে। ওসি বলেন, ‘আমরা গিয়ে দেখি উনার শরীরে পচন ধরে গেছে। বিশেষ করে পিঠে এবং চোখে রীতিমত পোকা দেখা যাচ্ছিল।’




