রূুপবান আমাদের জনপ্রিয় এক লোকগাথার ট্রাজিক চরিত্র - যেখানে বাদশাহ একাব্বর স্বপ্নে নির্দেশিত হয়ে তাঁর ১২ দিন বয়সী ছেলে রহিমের প্রাণ বাঁচাতে ১২ বছরের রূুপবানের সাথে বিয়ে দিয়ে শিশু কোলে রূপবানকে বনবাসে পাঠাতে বাধ্য করেন। এ যেন এক “বাঙ্গালির ইডিপাস” । যাক, সেই রহিম-রূপবানের লোকগাথা আজকের আলোচ্য বিষয় নয়। আজ এখানে “রূপবান” নামে একটি সামুদ্রিক মাছ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করবো। এই মাছটি আমরা অনেকেই চিনি না, এমনকি অনেকে এর নামও জানি না।
আমাদের দেশের সমুদ্র ও সমুদ্র উপকূলীয় জলাশয়ে নানান প্রজাতির ৪ শতাধিক মাছ রয়েছে। এরমধ্যে “রূপবান” একটি প্রজাতি। এর ইংরেজি নাম Japanese Threadfin Bream| Marcus Elieser Bloch নামে একজন জার্মান ডাক্তার ও প্রকৃতি বিজ্ঞানী ১৭৯১ সালে এ মাছটি প্রথম আবিস্কার করেন এবং এর নামকরণ করা হয় Sparus japonicus। পরবর্তীতে এর বৈজ্ঞানিক নাম পরিবর্তন করে Nemipterus japonicus রাখা হয়। এই মাছের স্থানীয় নাম রূপবান।।
রুপবান মাছ Perciformes বর্গের ও Nemipteridae পরিবারের অন্তর্ভূক্ত একটি প্রজাতি। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা তথ্যমতে আমাদের বঙ্গোপসাগরে এই পরিবারের “সোনাবান” (Nemipterus isocanthus), “কৃষ্ণকলি” (Scolopsis igcarensis) ও “সুন্দরী কমলা” (Scolopsis vosmari) নামে আরো ৩টি প্রজাতি রয়েছে। অপরদিকে, সারা বিশ্বে এই পরিবারের এ যাবত মোট ২৪টি প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। এ পরিবারের অধিকাংশ প্রজাতিই মাংশাসী স্বভাবের, অল্প কয়েকটি প্লাংকটনভোজী।
ইন্দো-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রূপবান মাছের ব্যাপক বিস্তৃতি রয়েছে। আমাদের দেশে মেঘনা সমুদ্র উপকুল, সুন্দরবন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সমুদ্র উপকূল এবং সাগর তীর থেকে ৯০ মিটার গভীর পর্যন্ত রূপবান মাছ ধরা পড়ে। রূপবান প্রজাতির মাছ লম্বায় সাধারনত ২০ থেকে ২২ সে. মিটার হয়; এ যাবত বিশ্বে সর্বোচ্চ ৩৪ সে. মিটার পর্যন্ত রূপবান মাছ আহরণের রেকর্ড রয়েছে। এরা ওজনে সাধারণত ২০০-৩০০ গ্রাম এবং সর্বোচ্চ ৫০০ গ্রাম হয়। রূপবান মাছের মুখ লম্বা, চোখ মাথার উপরের দিকে অবস্থিত, দেহ উপ-বৃত্তাকার ও সামান্য সংকুচিত। দেহের উপরিভাগে গোলাপী আভা এবং নীচের দিকে রূপালী সাদা রঙ হয়। চোখের আইরিশ লাল। পৃষ্ঠীয় পাখনা ১টি এবং এই পাখনায় ১০টি স্পাইন ও ৯টি নরম রস্মি আছে। অপরদিকে, পায়ূ পাখনায় ৩টি স্পাইন ও ৭টি নরম রস্মি আছে। পুচ্ছ পাখনা ২ ভাগে (ষড়নব) বিভক্ত; উপরের ভাগ অপেক্ষাকৃত সামান্য লম্বা এবং এতে লম্বা ফিলামেন্ট আছে। এই মাছের উপরের চোয়ালের সামনের দিকে ৪ থেকে ৫ জোড়া কেনাইন দাঁতের (canine teeth) মত দাঁত রয়েছে। জলাশয়ে এদের বসবাস উপযোগী তাপমাত্রা হচ্ছে ২০ থেকে ২৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এরা সমুদ্র উপকুলে ব্যাপকভাবে বিচরণ করে এবং ৫ থেকে ৮০ মিটার গভীরতায় ছোট ছোট মাছ, চিংড়ি, কেঁচো ও কৃমি জাতীয় খাবার খেয়ে এরা জীবনধারণ করে। ফুড ফিশ হিসেবে রূপবান মাছের যথেষ্ঠ পরিচিতি ও কদর রয়েছে। রূপবান মাছ উচ্চ পুষ্টিমান সমৃদ্ধ; প্রতি ১০০ গ্রাম মাছে ২০ গ্রাম প্রোটিন এবং ৫ গ্রাম চর্বি আছে। তাছাড়া, এই মাছে উচ্চ মাত্রায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড্ (৭৯৬.৫ মি. গ্রা./১০০গ্রা. মাছ), ভিটামিন বি৬/বি১২, সেলেনিয়াম এবং ক্যালসিয়াম ও আয়োডিন আছে। রূপবান মাছ সাধারণত পরিভ্রমণ করে না এবং মাংশাসি স্বভাবের। এরা জলাশয়ের তলদেশে খাবার খায়। রূপবান মাছকে প্রকৃতিতে মার্কারির উপস্থিতি নির্ণয়ে নির্দেশক হিসেবে গবেষণা কাজে ব্যবহার করা হয়।
এই মাছের গঠন ও ফ্লেভারের কারণে তাজা মাছের পাশাপাশি শুকনো, লবণযুক্ত, স্মোকড কিংবা ফারমেন্টেড অবস্থায় খাওয়া হয়। ছুরুমি এবং ফিশ মিল তৈরিতেও এই মাছ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। এজন্য রূপবান মাছের যথেষ্ট বাণিজ্যিক গুরুত্ব রয়েছে। কাঁদা বা বালিময় তলদেশে এরা বসবাস করতে পছন্দ করে। ট্রল নেট এবং গিল নেট দিয়ে রূপবান মাছ ধরা হয়। এ মাছের বাজার মূল্য তুলনামুলকভাবে কম (৩০০-৩৫০ টাকা/কেজি)। এদের জীবনকাল অপেক্ষাকৃত ছোট; এদের দৈহিক বৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং এক বছর বয়সেই এরা প্রজননক্ষম হয়ে যায়। দেহের আকারের তুলনায় রূপবান মাছের ডিম ধারণ ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত বেশি (২২৭০৯-২৬৭৩৬৫)। এদের প্রজননকাল অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। দক্ষিণ চীন সাগর ও লোহিত সাগরে এদের প্রজননকাল মে থেকে অক্টোবর এবং বঙ্গোপসাগরে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত। আইইউসিএন (ওটঈঘ) এর তথ্যমতে, আন্দামান সাগর ব্যাতীত প্রকৃতিতে এ মাছের উৎপাদন ও প্রাচুর্যতা স্থিতিশীল।
(লেখকঃ কৃষিবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ; সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। ই-মেইল : yahiamahmud@yahoo.com)







