ভরা মৌসুমে লাল মাটির উর্বরতায় গাছপাকা কাঁঠালের মিষ্টি সুগন্ধিতে মুখরিত থাকে গাজীপুরের গ্রাম-গঞ্জ ও হাট-বাজার। তবে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া দেশের জাতীয় ফল কাঁঠালের উপযুক্ত সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ না থাকায় প্রতি বছরই গাছে ও বাগানে পঁচে নষ্ট হয় বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল।

সেই লোকসানের গল্প বদলে দিতে এবার জেলার শ্রীপুর উপজেলায় এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ নিয়ে হাজির হয়েছেন উদ্যোক্তা আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া। সাধারণ ফল হিসেবে বিক্রি কিংবা অপচয়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে তিনি জাতীয় ফল কাঁঠাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করছেন পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ‘কাঁঠাল বিস্কুট’। কোনো প্রকার কৃত্রিম ফ্লেভার বা ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ছাড়াই প্রস্তুত করা এ উদ্ভাবনী বিস্কুট এখন অফলাইন ও অনলাইনে সমানভাবে বাজার মাতিয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
গাজীপুর জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এ জেলায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। যার সিংহভাগ অর্থাৎ সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি উৎপাদন হয় কেবল শ্রীপুর উপজেলায়।

উঁচু লাল মাটির গুণাগুণের কারণে শ্রীপুরের কাঁঠাল তার অনন্য স্বাদ, মিষ্টতা ও ঘ্রাণের জন্য সারা দেশেই সুপরিচিত। তবে বৈশাখ থেকে ভাদ্র এ দীর্ঘ মৌসুমে বাজারে একসংগে বিপুল পরিমাণ কাঁঠালের জোগান থাকলেও সংরক্ষণের অভাবে দাম পড়ে যায় এবং চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভাবছিলেন কীভাবে এ মৌসুমি অপচয় বন্ধ করে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করা যায়। নিজের বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এ সংকটকে রূপ দিয়েছেন সম্ভাবনায়। চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও জাপানের মতো এশীয় দেশগুলোতে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে চিপস, ক্যান্ডি, জ্যাম ও বিভিন্ন মুখরোচক খাদ্য তৈরির চিত্র দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন। দেশে ফিরে শ্রীপুরের বৈরাগীরচালা গ্রামের নিজের কারখানা ‘মোমতাহিনা ফুড অ্যান্ড অয়েল মিলস’-এর অধীনে ‘মেহমান ফুড’ ব্যানারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।

চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০০টি পাকা কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে তিনি বিস্কুট উৎপাদনে সাফল্য অর্জন করেন। এই বিস্কুটের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এতে কোনো কৃত্রিম কাঁঠালের ফ্লেভার ব্যবহার করা হয় না। প্রতিটি বিস্কুটে প্রায় ২০ শতাংশ তাজা ও প্রাকৃতিক কাঁঠালের পাল্প ব্যবহার করা হয়। এর সংগে ঘি, বাটার, উন্নতমানের দুধ, ময়দা এবং অন্যান্য উপাদান স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মেশানো হয়।
উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে কারখানার প্রধান কারিগর মানিক মিয়া জানান, প্রথমে খাঁটি পাকা কাঁঠালের কোষ ছড়িয়ে বীজ আলাদা করে তা ব্লেন্ড করা হয়। এরপর স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর নয়, এমন নিয়মে মিক্সার মেশিনে কাঁঠালের ঘন রসের সংগে বাটার, ঘি, দুধ ও ময়দা দিয়ে মাখিয়ে মণ্ড বা ডো তৈরি করা হয়। পরে টেবিল-টপে তা ডাইসের সাহায্যে নির্দিষ্ট বিস্কুটের আকারে কাটা হয়। প্রতি ট্রেতে ৩৬ পিস বিস্কুট সাজিয়ে ৩৬টি ট্রে এক সংগে ট্রলিতে করে বিশেষ ওভেনে ঢুকানো হয়। প্রায় ২৫ মিনিট নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বেক করার পর ওভেন থেকে বের করা হয়। বিস্কুট সম্পূর্ণ ঠান্ডা হলে তা সুন্দর ও বায়ুরোধক বক্সে প্যাকেটজাত করা হয়। বর্তমানে প্রতি প্যাকেটে ৮০০ থেকে ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট দিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে, যার বিক্রয়মূল্য রাখা হয়েছে ৭৫০ টাকা। বাজারজাতকরণের শুরু থেকেই ‘মেহমান ফুড’-এর কাঁঠাল বিস্কুট নিয়ে নেটিজেন ও ভোক্তাদের মাঝে দারুণ কৌতূহল ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।








