ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে বহুতল এই হাসপাতালটিতে প্রায়ই লিফটগুলো নিয়মিত বিকল ও অচল হয়ে পড়ে থাকায় এখন সাধারণ রোগী ও তাঁদের স্বজনদের চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন ভবনটি ৮ তলা এবং পুরনো ভনগুলো ৪ তলা তাই উপর তলার ওয়ার্ডগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগী ও স্বজনদের ওঠানামা করার ক্ষেত্রে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে সাড়ে চার হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন তলায় ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও প্যাথলজি বিভাগে রোগীদের যাতায়াতের জন্য বহুতল ভবনগুলোতে ১৫টি লিফট রয়েছে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অত্যাধিক ব্যবহারের কারণে লিফটগুলো প্রায়শই বিকল হয়ে পড়ে থাকে। ৫-৬টি লিফট চালু থাকায় অতিরিক্ত মানুষের ভীড়ে চাপাচাপি করে ওঠানামা করতে গিয়ে পকেট মার, চুরি, ঘাম, বাগবিতন্ডা, ধাক্কাধাক্কি, সময় অপচয়সহ নানান সমস্যার শিকার হতে হচ্ছে ভূক্তভোগীদের। ট্রলি নিয়ে রোগী ওঠানামার প্রয়োজন হলে দুর্ভোগের মাত্রা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
কোনো কোনো ভবনের লিফট সপ্তাহের পর সপ্তাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, আবার যেগুলো চালু থাকে সেগুলোতেও যান্ত্রিক ত্রুটি থাকে। কর্তৃপক্ষের হিসেবে ১২টি লিফট সচল থাকলেও সরেজমিনে দেখা যায় রোগীদের জন্য নতুন ভবনে ২টি ও পুরাতন ভবনে রোগীদের জন্য একটি করে লিফট চালু থাকে মাত্র। নতুন ভবনে চিকিৎসক ও স্টাফদের জন্য পৃথক একটি লিফট চালু থাকে। এছাড়া অউটডোরে দুটি লিফট চালু থাকলেও সেগুলো দিয়ে সর্বোচ্চ তৃতীয় তলা পর্যন্ত উঠা যায়। অন্যান্য লিফটগুলো বেশিরভাগ সময়ই সুকৌশলে বন্ধ রাখা হয়।
মমেক হাসপাতালের লিফটগুলো ইজারা নিয়ে নাঈমা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব পালন করছে। অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে প্রায়শই বিকল হচ্ছে লিফটগুলো। আবার বিকল হওয়া লিফট মেরামতেও সময় ক্ষেপনের এবং লিফট চলাকালীন সময়ে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছেন লিফট অপারেটররা। এসব লিফটে বিদ্যুৎ চলে গেলেও দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে হয় পৃথক জেনারেটর বা ব্যাকআপ সুবিধা না থাকায়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
লিফট বিকল হলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন মুমূর্ষু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী এবং পঙ্গু রোগীরা। স্ট্রেচার বা হুইলচেয়ারে থাকা রোগীদের ওপরের তলার ওয়ার্ডগুলোতে নিয়ে যেতে লিফটের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বাধ্য হয়ে অনেক সময় স্বজনরা মুমূর্ষু রোগীকে ঝুকি নিয়ে কোলে তুলে বা ফ্লোর থেকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে যান।
মমেক হাসপাতালের লিফটগুলোর সামনে প্রতিদিন সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ একযোগে ওঠার চেষ্টা করায় সচল লিফটগুলোতেও সৃষ্টি হয় চরম বিশৃঙ্খলা। এর ওপর লিফট অপারেটরদের দায়িত্বহীনতা ও অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ তুলেছেন অনেক ভুক্তভোগী। একাধিকবার সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত তদারকি ও সার্ভিসিংয়ের অভাবের পাশাপাশি পুরোনো যন্ত্রাংশ ও গণপূর্ত বিভাগের (পিডব্লিউডি) ধীরগতির রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ার কারণেই এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। কোনো লিফট নষ্ট হলে তা মেরামতের জন্য বাজেট অনুমোদন ও টেকনিশিয়ান আসতে বেশ কয়েকদিন সময় লেগে যায়, যার চরম মাশুল দিতে হয় সাধারণ রোগীদের।
সুজন ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, একটি বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালে লিফট বিকল থাকার ঘটনা সাধারণ কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং এটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার চরম উদাসীনতার প্রকাশ। অনতিবিলম্বে নষ্ট লিফটগুলো স্থায়ীভাবে মেরামত করা, নতুন লিফট সংযোজন এবং নিয়মিত টেকনিক্যাল তদারকি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক জাকিউল ইসলাম জানান, লিফটে ত্রটি থাকায় সবাইকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। চিকিৎসক ও নার্সদের প্রায়সময় পায়ে হেটে সিড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে হয়। ইাজারাদার প্রতিষ্ঠানকে বারবার তাগাদা দিলেও তাদের দায়সারা ভূমিকার জন্য সবাইকে কষ্ট করতে হচ্ছে।
গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জানান, শীঘ্রই তিনি হাসপাতাল পরিদর্শনে যাবেন এবং বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিবেন।






