পূূর্বশত্রুতার জের ধরে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ছাত্রলীগ কর্মী নাহিয়ান রবিন (২৩) পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে যুবলীগের কর্মী রাজিব (৪২)। এ সময় তার কাছ থেকে ৩টি রিভলবার, ৭ রাউন্ড তাজা গুলি, ১২ রাউন্ড কার্তুজের গুলি, ১০০ পিস ইয়াবা, ইয়াবা খাওয়ার সরঞ্জাম, চাপাতি, চাইনীজ কোড়ালসহ অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে গফরগাঁও পৌর শহরের কলেজ রোড এলাকার নিজ বাসা থেকে রাজীবকে গ্রেপ্তার করে থানা পুলিশ।
এর আগে ৮ জুন রাত পৌনে ১টার দিকে পৌর শহরের মহিলা কলেজের পেছনের মাজার রোড এলাকায় নৃশংসভাবে কুপিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী রবিনকে হত্যা করা হয়। নিহত রবিন পৌর শহরের মহিলা কলেজ রোড শিলাসী এলাকার মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে এবং কান্দিপাড়া আব্দুর রহমান ডিগ্রী কলেজের শিক্ষার্থী। সে বিগত সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। তবে বর্তমানে রবিন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে দাবি পরিবারের।
থানা-পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত রবিন ও গ্রেপ্তারকৃত রাজীবের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। উভয়েই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব একাধিকবার সহিংসতায় রূপ নেয়। এসব কারণে তারা পূর্বে দায়ের হওয়া একটি মামলাতেও জড়িয়ে পড়ে।
অপর একটি সূত্র জানায়, নিহত রবিন গফরগাঁওয়ের সাবেক পৌর মেয়রের অনুসারি তাজমুনের গ্রুপের সমর্থক ছিল। এছাড়াও ঘাতক রাজীব ছিল এমপি বাবেলের পিএস সোহেলের অনুসারী। সে অস্ত্র ব্যবসায়ি হিসাবে সমাধিক পরিচিত। তার বিরুদ্ধে মাদক, অপহরণ এবং একটি মারপিটের মামলা রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহত রবিনের বন্ধুরা জানায়, ৯ জুন ছিল নিহতের রবিনের জন্মদিন। এ উপলক্ষে রবিনের বন্ধুদের পক্ষ থেকে শহরের পশু হাসপাতাল রোডের বউ বাজার এলাকায় জন্মদিন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জন্মদিনের কেক কেটে মায়ের হাতে ভাত খাওয়ার জন্য রবিন বন্ধুদের তাগাদা দেয় তাড়াতাড়ি অনুষ্ঠান শেষ করার জন্য। অনুষ্ঠান শেষে বন্ধু মাসুমের মোটরসাইকেল যোগে কাছেই বাড়ির পথে রওনা দেয় রবিন। এ সময় রবিন মোটর সাইকেলের পিছনে বসা ছিল।
পথে রবিনদের বাড়ি থেকে প্রায় ১’শ মিটার দুরে মাজারবাড়ি রোড ও কলাবাগান রোডের মোড়ে মটরসাইকেলটি পৌছলে আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা গামছা দিয়ে মুখ বাঁধা ৫ থেকে ৬ জনের অজ্ঞাতনামা একদল দূর্বত্ত মোটর সাইকেলের গতিরোধ করে। এ সময় দুর্বৃত্তরা রবিন ও মাসুমের চোখে-মুখে মরিচের গুড়া ছিটিয়ে দিয়ে পাইপ দিয়ে রবিন ও মাসুমকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। ঘটনার সময় মাসুম দৌড় দিয়ে বাঁচতে পারলেও সন্ত্রাসীরা রবিনকে ঘেরাও করে তার হাত, পাত ও মাথায় এলাপাথারি কোপাতে থাকে। হামলার শব্দ শুনে আশেপাশের বাসা-বাড়ির লোকজন বারান্দায় এসে ঘটনা দেখে চিৎকার শুরু করলে সন্ত্রাসীরা মাজারবাড়ি রোড এলাকা দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে এলাকাবাসী গুরুতর আহত রবিনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠালে রাত সাড়ে তিনটার দিকে রবিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
নিহত রবিনের মা শান্তা বেগম (৪২) বলেন, রবিন আমাকে ফোন করে বলেছিল, মা আসতেছি। কথা ছিল বাসায় এসে তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমার হাতে ভাত খাবে। কিন্তু ছেলে তো আসলো না, আসলো ছেলের লাশ। আমি আমার ছেলের খুনীদের ফাঁসি চাই।
নিহত রবিনের পিতা মোফাজ্জল হোসেন (৪৬) কাঁদতে কাঁদতে বলেন, প্রায় সাড়ে ৪ বছর আগে ফুটবল খেলা নিয়ে রাজীবের সাথে অনেক আগে আমার একটি ঝামেলা হয়েছিল। কিন্তু আমার ছেলের কোন শক্র ছিল না, আমি আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।
এদিকে রবিন হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনে সন্দেহভাজন যুবলীগ কর্মী রাজীবের স্থানীয় কলেজ রোড এলাকার আলাল মার্কেটের মোতালেব প্লাজায় অভিযান চালায় থানা-পুলিশ। এ সময় রাজীবের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে সিঁড়িতে রক্তমাখা জুতার দাগ পেয়ে রবিন হত্যাকান্ডে তার সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়ে মোতালেব প্লাজার চতুর্থ তলার একটি বাসা থেকে ব্যবসায়ী মোতালেব মিয়ার ছেলে নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগের কর্মী ব্যবসায়ি রাজিব (৪২) কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় তার বাসা থেকে ৩টি রিভলবার, ৭ রাউন্ড তাজা গুলি, ১২ রাউন্ড কার্তুজের গুলি, ১০০ পিস ইয়াবা, ইয়াবা খাওয়ার সরঞ্জাম, চাপাতি, চাইনীজ কোড়ালসহ অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ.স.ম আতিকুর রহমান বলেন, হত্যাকান্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার প্রাথমিক আলামত পাওয়ায় বিপুল অস্ত্রসহ রাজীব নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলমান আছে। মামলা দায়ের প্রক্রিয়াধীন। ওসি আরো বলেন, নিহতের শরীরের রক্ত, ঘটনাস্থলের রক্ত এবং রাজীবের বাড়ীর সিঁিড়তে পাওয়া রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে। এতে হত্যাকান্ডের জট অনেকটাই খুলে যাবে বলে আশা করছি।
এবিষয়ে জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, গ্রেপ্তারকৃত রাজীবের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে সিঁড়িতে রক্তমাখা জুতার দাগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে- এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। আশা করছি খুব দ্রুত এ ঘটনায় জড়িত অন্যরাও গ্রেপ্তার হবে।





