ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং লাভজনক বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে ফিফা। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রীড়া ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিবেশদূষণকারী আসরও হতে যাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ।
সুইজারল্যান্ডে লুজান বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউনিল) ভূগোলবিদ ডেভিড গগিশভিলি এএফপিকে বলেন, ‘অলিম্পিক গেমসে বিগত কয়েকটি আসরে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ক্রমেই কমতে দেখা গেছে। কিন্তু ফিফার ছেলেদের বিশ্বকাপে চিত্রটা সম্পূর্ণ উল্টো।’
আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এবার বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো দলের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮ করা হয়েছে। পাশাপাশি এবারই প্রথম যৌথভাবে তিনটি দেশে (মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র) অনুষ্ঠিত হবে এই আসর।
ইউনিলের গবেষণা অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপ থেকে রেকর্ড পরিমাণ আয় হলেও এটি ‘আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা কার্বন নিঃসরণের রেকর্ড তৈরি করবে।’
গগিশভিলি আরও জানান, ইউনিলের হিসাব মতে এবার কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৫০ থেকে ৯০ লাখ টন। ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল ‘প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন’।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ২১ লাখ ৭০ হাজার টন। রাশিয়া বিশ্বকাপে এবারের চেয়ে ৪০টি ম্যাচ কম অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল ৩১ লাখ ৭০ হাজার টন। কাতার বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলো তড়িঘড়ি করে তৈরি করা হয়, অতিরিক্ত বড় ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় তীব্র সমালোচনাও হয়।
২০১৮ সালে ‘ইউনাইটেড ২০২৬’ আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, এবারের আসরে ১৬টি ভেন্যুই আগে থেকে প্রস্তুত ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট ভেন্যু টরন্টোয় আসনসংখ্যা ৪৫ হাজার এবং সবচেয়ে বড় ভেন্যু টেক্সাসের আরলিংটনে আসনসংখ্যা ৯৪ হাজার। তবে মূল সমস্যাটি হচ্ছে স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যকার বিশাল দূরত্ব।
যেমন—মায়ামি থেকে ভ্যাঙ্কুভারের দূরত্ব ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি। এই বিশাল দূরত্বের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরগুলোর কার্বন নিঃসরণের প্রধান উৎস; আকাশপথের ভ্রমণ বহুগুণ বেড়ে যাবে। দল, কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং বিশেষ করে ফিফার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ‘৫০ লাখের বেশি সমর্থক’কে এই দীর্ঘ পথ বিভিন্ন যানবাহনে পাড়ি দিতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে কেবল গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলতেই টরন্টো, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং সবশেষে সিয়াটলে যেতে মোট ৫ হাজার ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে।
পরিবেশ সুরক্ষা প্রশ্নে ফিফার ‘উদাসীনতা’
গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কপ২৬ জলবায়ু সম্মেলনে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজের ‘দৃঢ় প্রতিজ্ঞা’ জানিয়েছিলেন। বিশ্বকাপের কার্বন নিঃসরণ ‘পরিমাপ, হ্রাস ও ক্ষতিপূরণ’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপকে ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ হিসেবে মিথ্যা প্রচারের দায়ে ২০২৩ সালের জুনে সুইস ফেয়ারনেস কমিশন (সিএসএল) ফিফাকে তিরস্কার করে। এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে এমন কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
গগিশভিলি বলেন, পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে মেগা ইভেন্টগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর একমাত্র উপায় হলো এর পরিধি সীমিত করা। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি যেমন গ্রীষ্মকালীন গেমসে অ্যাথলেটদের সংখ্যা ১০,৫০০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে সেটি করে দেখিয়েছে।





