ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী ঝলঝলিয়া গ্রামে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর গুলিতে রোমান মিয়া (৪৫) নামে এক ব্যবসায়ি নিহত হয়েছেন। সোমবার ভোর পৌণে ৬ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত রোমান মিয়া উপজেলার বেতকুড়ি গ্রামের রফিকুল ইসলামের পুত্র। তিনি স্থানীয় বাঘাইতলা বাজারের ইজারাদার ও কাপড় ব্যবসায়ী। তিনি ভারত থেকে চোরাইপথে গরু কারবারের সাথেও জড়িত বলে তার ভাই স্বীকার করেছেন। কেউ কেউ বলছেন রোমান মিয়া গরু চোরাচালানের সাথে জড়িত নয় তিনি আরেকজনের গরু ছাড়িয়ে আনতে গিয়েছিলেন।
এদিকে স্থানীয়ভাবে বিজিবির সাথে চোরাকারবারিদের গরু চোরাচালানের নিয়ে লেনদেনের বকেয়া নিয়ে এ ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হলেও বিজিবি তা অস্বীকার করেছেন। এঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনার পর নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসী সড়ক অবরোধ করে হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ৩৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের এক বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে ময়মনসিংহ ৩৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হালুয়াঘাট উপজেলাধীন তেলিখালী বিওপির সীমান্তের শূন্য রেখা থেকে আনুমানিক ১ কিলোমিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঝলঝলিয়ায় চোরাচালানবিরোধী অভিযান চালিয়ে কয়েকটি গরু আটক করে। ফেরার পথে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। প্রথমে মৌখিকভাবে হামলাকারিদের সতর্ক করার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলিবর্ষণ করা হয়। এরপর হামলা অব্যাহত থাকায় আত্মরক্ষার্থে গুলি চালালে এক চোরাকারবারি গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে হালুয়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিজিবির কড়ইতলী বিওপির কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার মোঃ আব্দুল কাদির জানান, নিহত রোমান মিয়া একজন চোরাকারবারি। ভারতীয় গরু নিয়ে যাওয়ার সময় তেলীখালী ও কড়ইতলী সীমান্ত ফাঁড়ির যৌথ টহলদল তাদের চ্যালেঞ্জ করলে তারা বিজিবির ওপর হামলা করে। বিজিবি সদস্যদের আহত করে। এসময় নায়েক রফিকের গোলাভর্তি বন্দুক দিয়ে সাবধান করার জন্য প্রথমে ফাঁকা আওয়াজ করা হয়। পরবর্তীতে চোরাকারবারি রোমান বিজিবি সদস্য রফিকের হাতে আঘাত করলে তার বন্দুক থেকে অনিচ্ছায় গুলি বের হয়ে রোমান গুলিবিদ্ধ হয়। পরে তাঁকে হালুয়াঘাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত রোমানের ছোট ভাই আবু রায়হান বলেন, খবর পেয়ে তাঁর ভাই রোমান ঝলঝলিয়া গ্রামে যান। সেখানে বাঘাইতলা বাজারের ইজারাসংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে তাঁকে গুলি করা হয়। আবু রায়হান অভিযোগ করেন, ভোর ৫ টার দিকে গুলির ঘটনা ঘটলেও প্রায় তিন ঘণ্টা তাঁর ভাইকে ঘটনাস্থলে আটকে রাখা হয়। তিনি আরো অভিযোগ করেন, ভারত থেকে গরু আনার বিষয়ে বিজিবির সাথে তাঁদের লেনদেন ছিল এবং প্রতি সপ্তাহে বিজিবিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়া হতো। কিন্তু এ সপ্তাহে চুক্তি অনুযায়ী টাকা দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় বিজিবি সদস্য রোমানকে গুলি করে। তিনি বলেন, তেলিখালী ক্যাম্পে নেওয়ার পর রোমানের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় তিনি ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য আকুতি জানালে বিজিবির সদস্য ‘রফিক’ তাঁকেও বুকে বন্দুক উঁচিয়ে গুলি করার হুমকি দেন।
স্থানীয় ইউপি’র সদস্য আব্দুল জব্বার বলেন, সীমান্ত এলাকার অনেকেই গরুর ব্যবসা করেন। গরু চোরাচালেনের ব্যাপারে বিজিবির সাথে সপ্তাহে তিন লাখ টাকা কন্ট্রাক হয়েছে। সেই টাকা না দেয়ার কারণে গরু আটক করেছে। রোমান বিজিবি সদসদ্যের বলেছে, গরু ছেড়ে দেন টাকা পেয়ে যাবেন। এনিয়ে বাগ্বিতণ্ডায় সীমান্ত থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে তাঁকে এভাবে গুলি করে হত্যা করা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।"
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সীমান্তের ঝলঝলিয়ায় এলাকায় বিজিবি সদস্যরা অভিযানে এলে গরু চোরাকারবারি রোমানের সাথে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এসময় চোরাই গরু নিয়ে যেতে চাইলে নোমানসহ সঙ্গীয়রা বাঁধা দেয় এবং বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা করে। এতে এক বিজিবি সদস্য আহত হন। এসময় আত্মরক্ষার্থে বিজিবি সদস্যদের ছোঁড়া গুলিতে চোরাকারবারি নোমান গুলিবিদ্ধ হয়। পরে হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায় সে।
হাসপাতাল সূত্রে ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মৃত্যুর পর বিজিবি সদস্যরা প্রথমে হাসপাতালে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়নি এবং স্বজন ও স্থানীয়দের মৃতদেহ দেখতে বাধা সৃষ্টি করে। এতে উপস্থিত উৎসুখ জনতার মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বিজিবি সদস্যরা অস্ত্র উঁচিয়ে জনতাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও তীব্র প্রতিবাদের মুখে হাসপাতাল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে হালুয়াঘাট থানা পুলিশ খবর পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছায় এবং পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ এনে স্থানীয় উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করে।
এ ব্যাপারে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ৩৯ বিজিবির ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে: কর্নেল মো: নূরুল আজিম বায়েজিদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, আজ ভোর ৫টার দিকে টহলরত বিজিবির সদস্যরা চারটি গরু আটক করে। সীমান্তের ২০০/৩০০ গজ অভ্যন্তরে চোরাকারবারিরা বিজিবি সদস্যদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এসময় হামলাকারিদের সতর্ক করতে আকাশে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করা হয়। বিজিবির যে সদস্য ফাঁকা গুলিবর্ষণ করেছিল তাকে পেছন থেকে চোরাকারবারিদের একজন ঝাপটে ধরলে বিজিবি সদস্য ন্যূইয়ে পড়ে এবং তার হাতে থাকা গুলিভর্তি রাইফেল থেকে একটি গুলি বের হয়ে যায়। সেই গুলিতে সামনে থাকা রোমান গুলিবিদ্ধ হয়। মাত্র ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে এই ঘটনা ঘটে।
বিজিবি’র সাথে চোরাকারবারিদের লেনদেনের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে কেউ অভিযোগ করতে পারে। কিন্তু এটা কী সত্য। চুক্তিবদ্ধ লোকদের সাথে এমন ঘটনা ঘটার কথা নয় বলে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তের বিষয়। এটা সঠিক নয়। তবে স্বচ্ছতার সাথে তদন্ত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
হালুয়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন বলেন, বিজিবির গুলিতে একজন মারা গেছেন। তবে আসলে কীভাবে কী হয়েছে, তা তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে।







