ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত চার হাজার ৩০০ বাসিন্দা। দেশটিতে পরপর ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের পর ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া শত শত মানুষকে উদ্ধারে দিনরাত অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকায় শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, আর হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
এদিকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে তৈরি একটি ওয়েবসাইটে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি হয়, যা ১৯০০ সালের পর দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে দুর্বল হয়ে পড়া ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো এই দুর্যোগে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একের পর এক আফটারশকের কারণে উদ্ধার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাদো জানিয়েছেন, বিভিন্ন হাসপাতালে এ পর্যন্ত অন্তত ২৩৫ জনের মরদেহ আনা হয়েছে। তবে মোট নিহত ও আহতের সংখ্যা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি।
জাতীয় পরিষদের প্রধান জর্জ রদ্রিগেজ জানান, অন্তত ২০০ জন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন এবং প্রায় ২৫০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে অন্তত আটটি হাসপাতাল, ভেনেজুয়েলা রেড ক্রসের সদর দপ্তর এবং ফরাসি দূতাবাস।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো বলেন, শুধু লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যেই প্রায় ৭০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী-সংলগ্ন উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্য। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ একে ‘দুর্যোগপূর্ণ এলাকা’ ঘোষণা করে বলেন, উদ্ধার তৎপরতা আরও দ্রুত করতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কারাকাসের প্রধান বিমানবন্দর সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। বিমানবন্দরের ভেতরের ভিডিওতে ছাদের অংশ ভেঙে পড়ার দৃশ্য দেখা গেছে।
জরুরি কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা রাতভর ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করছেন। তবে অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, কিছু এলাকায় সরকারি সহায়তা পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।
লা গুয়াইরা শহরের বাসিন্দা ইয়ামিলেথ জিমেনেজ জানান, সাততলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধসে তার ১৯ বছর বয়সী ছেলে এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছে।
একই শহরে বহু স্বেচ্ছাসেবক খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ করছেন। কারাকাস-লা গুয়াইরা মহাসড়কে সাধারণ মানুষ পানি, খাবার ও ওষুধ নিয়ে দুর্গতদের সহায়তায় ছুটে যাচ্ছেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের একজন ৬৪ বছর বয়সী পেদ্রো পেরেজ বলেন, ‘আমরা সব হারিয়েছি। খাবার নেই, ওষুধ নেই। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে এখন রাস্তায় রাত কাটাচ্ছি।’
সরকারি ছুটির দিনে ভূমিকম্প হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ বাড়িতে ছিলেন। কম্পন শুরু হতেই আতঙ্কে তারা ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। রাজধানী কারাকাস এবং উপকূলীয় বিভিন্ন শহরে অসংখ্য ভবন দুলতে থাকে বা ধসে পড়ে।
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছে কারাবোবো অঙ্গরাজ্যের মোরন শহরে বহু বাড়িঘর ধসে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত একটি আবাসিক প্রকল্পের প্রায় ২০০ পরিবার নিজেদের মালপত্র উদ্ধার করে আত্মীয়দের বাড়ি বা অস্থায়ী আশ্রয়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছাতে পারে এবং তা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ারও উল্লেখযোগ্য আশঙ্কা রয়েছে।
দুর্যোগের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভেনেজুয়েলাকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দিতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধারকারী দল পাঠানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দরের কার্যক্রম পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।
জাতিসংঘও আন্তর্জাতিক উদ্ধার অভিযান সমন্বয় করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ভয়াবহ এই দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যাপক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবাদাতা স্টারলিংক জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নতুন ও বিদ্যমান গ্রাহকদের জন্য ২৫ জুলাই পর্যন্ত বিনা মূল্যে সেবা দেওয়া হবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে অতিরিক্ত টার্মিনাল স্থাপন করা হবে।
তবে দেশটির তেল শিল্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিদেশি জ্বালানি কোম্পানিগুলো।






