গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো পরপর দুটি দেশ সফর করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এশিয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দুটি সহযোগী দেশ মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে তিনি এই সফর করবেন।
প্রধানমন্ত্রী ২১ জুন দুই দিনের সফরে মালয়েশিয়া যাবেন। এরপর তিনি চার দিনের সফরে চীনে পৌঁছাবেন। চীন সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ২৬ জুন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক।
এই বৈঠকটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন শি জিনপিং।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই সফরের উদ্দেশ্য হলো আঞ্চলিক দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর করা। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকারে যে দেশগুলো বড় ভূমিকা রাখবে, তাদের সঙ্গে দেশের সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করাই এর লক্ষ্য।
মালয়েশিয়া সফর
গত এপ্রিল মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বেইজিং সফরের সময় চীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে ঢাকা তারেক রহমানের এই বিদেশ সফরটি মালয়েশিয়া থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে এশিয়ার ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এর ফলে বাংলাদেশ কোনো ধরনের সংবেদনশীলতা এড়িয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে পারবে।
তারেক রহমান ২১ জুন সন্ধ্যায় কুয়ালালামপুরে পৌঁছাবেন। ২২ জুন তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বসবেন। এরপর দুই দেশের প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
দুই নেতার উপস্থিতিতে সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্য বিনিময় বিষয়ক কয়েকটি চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। এই সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এবং বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা থাকবেন। দুই দেশের কর্মকর্তারা একটি যৌথ বিবৃতি চূড়ান্ত করার কাজ করছেন।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। দেশটি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। এছাড়াও মালয়েশিয়া থেকে জ্বালানি সম্পদ, রাবার ও পাম তেল আমদানি করে বাংলাদেশ।
চীন সফর
তারেক রহমান ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করবেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে কোনো বিশ্ব পরাশক্তিতে তার প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর। এই সফর থেকে চীনের প্রতি নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে তা বোঝা যাবে। চীন বাংলাদেশের একটি বড় উন্নয়ন সহযোগী এবং অবকাঠামো খাতে অর্থায়নের অন্যতম উৎস।
বেইজিংয়ে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী ২৩ জুন থেকে ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস’ সম্মেলনে যোগ দেবেন।
২৫ জুন চীনের প্রিমিয়ার লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পানিসম্পদ, জ্বালানি সহযোগিতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি স্থান পাবে। বর্তমানে একটি যৌথ বিবৃতি প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং বেশ কয়েকটি চুক্তি সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যেসব বিষয়ের দিকে নজর থাকবে
কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফর নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করতে পারে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে প্রস্তাবিত তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প। এ ছাড়া চীনের তিনটি প্রধান উদ্যোগ—গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ এবং গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কী হয়, সেদিকে সবার নজর থাকবে।
এই সফরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো থেকে বোঝা যাবে তারেক রহমানের সরকার কিভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, উন্নয়নমূলক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়।
শীর্ষ রাজনৈতিক স্তরে এই বৈঠকের পরিকল্পনার কারণে মালয়েশিয়া ও চীন সফর নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হতে যাচ্ছে।




