অন্যের জীবন বাঁচাতে দিয়েছিলেন রক্ত। তখনও তিনি জানতেন না কী অপেক্ষা করছে তার জন্য! কোনো পরীক্ষা ছাড়াই তার কাছ থেকে রক্ত নেওয়া হয়েছিল। কিছুদিন পর বিদেশ যাওয়ার জন্য মেডিকেল পরীক্ষা করতে গিয়ে জানতে পারেন, শরীরে বাসা বেঁধে আছে একটি ভাইরাস। হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত তিনি।
এরপর বদলে যায় ময়মনসিংহ নগরের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের ওই বাসিন্দার জীবন। রোগ শনাক্ত হওয়ার সময় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় খরচ হয় প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এখন নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। একটি ট্যাবলেটের দাম ৫০ টাকার বেশি। নির্দিষ্ট সময় পরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করাতে হয়। শুধু ডিএনএ পরীক্ষাতেই কখনো ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
চিকিৎসার এই ব্যয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেক বাস্তবতা। হাসপাতালে যাওয়া, পরীক্ষা করানো ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সময় পরিবারের একজনকে প্রায় সবসময় তার সঙ্গে থাকতে হয়। ফলে চিকিৎসার খরচের পাশাপাশি স্বজনদের সময় ও অর্থের চাপও বাড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, আমি কীভাবে আক্রান্ত হয়েছি, সেটা সঠিকভাবে জানি না। প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রক্ত দিয়েছিলাম। রক্ত দেওয়ার সময় জানতাম না আমার শরীরে কোনো সমস্যা আছে। আমার রক্তের গ্রুপ আগে থেকেই জানা ছিল। গিয়ে বলেছিলাম, আমার রক্তের গ্রুপ ও পজিটিভ। এরপর কোনো পরীক্ষা ছাড়াই রক্ত নিয়ে নেয়। পরে বিদেশ যাওয়ার আগে মেডিকেল পরীক্ষায় হেপাটাইটিস ধরা পড়ে।
চিকিৎসার জন্য ঢাকাতেও গিয়েছেন তিনি। পরে ময়মনসিংহে চিকিৎসা নেওয়াকে সুবিধাজনক মনে হয়েছে তার। কারণ চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রায় একই ধরনের হলেও ঢাকায় যাতায়াত এবং থাকা-খাওয়ার বাড়তি খরচ রয়েছে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও কয়েকজন। নগরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে প্রথমবার রক্ত দিতে গিয়ে নুসরাত জাহান রাখির অভিজ্ঞতাও ছিল উদ্বেগের। তিনি বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর বাইরে থেকে একজন টেকনিশিয়ান এসে শুধু রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে রক্ত সংগ্রহ শুরু করেন।
ময়মনসিংহ ব্লাড ব্যাংক ট্রান্সফিউশন সেন্টারের পরিচালক মমিনুর রহমান প্লাবন বলেন, রক্ত সংগ্রহের আগে নির্দিষ্ট স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন। কিন্তু কোথাও শুধু স্ট্রিপ দিয়ে পরীক্ষা, আবার কোথাও কেবল রক্তের গ্রুপিং করেই রক্ত সংগ্রহ করা হয়।
রাখি বলেন, ‘রক্ত নেওয়ার আগে কিছু পরীক্ষা করা হয় বলে শুনেছিলাম। কিন্তু প্রথমবার রক্ত দিতে গিয়ে কোনো পরীক্ষা করল না। যেহেতু প্রথম, আমি তো জানতাম না আমার রক্তে কোনো সংক্রমণ আছে কি না।’
সরকারি হাসপাতালেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন জহিরুল ইসলাম। তার ভাষ্য, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রক্ত দিতে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পরই রক্ত নেওয়া শুরু হয়। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি।
রক্তদাতা থেকে গ্রহীতা, উভয়ের ঝুঁকি
ময়মনসিংহ ব্লাড ব্যাংক ট্রান্সফিউশন সেন্টারের পরিচালক মমিনুর রহমান প্লাবনের দাবি, ময়মনসিংহ জেলায় সরকার অনুমোদিত তিনটি ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন ক্লিনিক ও ব্যক্তিপর্যায়ে অনুমোদনহীনভাবে ব্লাড ব্যাংক পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। তার ভাষ্য, রক্ত সংগ্রহের আগে নির্দিষ্ট স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন। কিন্তু কোথাও শুধু স্ট্রিপ দিয়ে পরীক্ষা, আবার কোথাও কেবল রক্তের গ্রুপিং করেই রক্ত সংগ্রহ করা হয়।
প্লাবন বলেন, ‘একজন ডোনারের কাছ থেকে রক্ত নেওয়ার আগে নির্দিষ্ট কিছু স্ক্রিনিং ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই ন্যূনতম মান বজায় রাখা হয় না।’ তার মতে, শুধু রক্তের গ্রুপ মেলানো যথেষ্ট নয়। দাতার রক্তে হেপাটাইটিস বি ও সি, এইচআইভি, সিফিলিসসহ রক্তের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে এমন রোগের স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), ময়মনসিংহ মহানগরের সম্পাদক আলী ইউসুফের পরিবারেও হেপাটাইটিস বি নিয়ে এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার পরিবারের এক সদস্য নিয়মিত রক্ত দিতেন। একবার রক্ত দেওয়ার কিছুদিন পর বিদেশ যাওয়ার জন্য মেডিকেল পরীক্ষা করালে হেপাটাইটিস বি ধরা পড়ে।
আলী ইউসুফ বলেন, প্রথমে ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা করানো হয়। একাধিক জায়গায় পরীক্ষা করানোর পর হেপাটাইটিস বি ধরা পড়ে। এরপর থেকে তার চিকিৎসার পেছনে প্রচুর অর্থ খরচ হচ্ছে। তার ভাষ্য, ‘পরিবারের ওই সদস্য হাসপাতাল থেকে প্রথমে স্ক্রিনিং করে সমস্যা নেই বলে জানতে পেরেছিলেন। পরবর্তী সময়ে হেপাটাইটিস বি শনাক্ত হয়।’
তবে এই ঘটনাতেও হেপাটাইটিস সংক্রমণের সুনির্দিষ্ট উৎস রক্তদান বা রক্ত গ্রহণ ছিল কি না, তা চিকিৎসা-নথি ও মহামারিবিদ্যাগত অনুসন্ধান ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কারণ, হেপাটাইটিস বি শুধু রক্তের মাধ্যমে নয়, আক্রান্ত মা থেকে শিশুর মধ্যে জন্মের সময়, যৌন সংস্পর্শ এবং অনিরাপদ সূচ বা ধারালো যন্ত্রের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।
আছে রক্তের কালোবাজারির অভিযোগও
রক্তের কালোবাজারি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। মানবিক বিষয়কে পুঁজি করে একটি চক্র এ কাজে জড়িত থাকতে পারে বলে জানা যায়। এতে কিছু রক্তদাতা ও রক্তদাতা সংগঠন, হাসপাতালের কর্মচারী, ক্লিনিকের দালাল এবং বেসরকারি খাতে রক্ত সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অনেক সময় রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহের পর রোগীর আর প্রয়োজন না হলে সেই রক্ত বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ক্রস ম্যাচিং না করেই অর্থের বিনিময়ে রক্ত সরবরাহ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), ময়মনসিংহ মহানগরের সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, ‘রক্তের কালোবাজারির ক্ষেত্রেও মানবিক বিষয়টিকে পুঁজি করে একটি চক্র কাজ করে। এর সঙ্গে কিছু রক্তদাতা ও রক্তদাতা সংগঠন, হাসপাতালের কর্মচারী, বিভিন্ন ক্লিনিকের দালাল এবং বেসরকারি খাতে রক্ত সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জড়িত থাকতে পারে।’
ময়মনসিংহে আসলে কতজন আক্রান্ত?
এই অনুসন্ধানে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে রোগীর সংখ্যা নিয়ে। ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফয়সল আহ্মেদ জানিয়েছেন, হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বা এ রোগে মৃত্যুর বিষয়ে তাদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই।
হেপাটাইটিস বি মূলত আক্রান্ত মা থেকে শিশুর মধ্যে জন্মের সময়, শৈশবে, আক্রান্তের রক্ত বা শরীরের তরলের সংস্পর্শ, অনিরাপদ ইনজেকশন এবং ধারালো যন্ত্রের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। আর হেপাটাইটিস সি রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। অনিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি, স্ক্রিনিং ছাড়া রক্ত, একই সুচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণেও সংক্রমণ হতে পারে।
অর্থাৎ ২০২৫ বা ২০২৬ সালে ময়মনসিংহ জেলার হেপাটাইটিস বি ও সি আক্রান্ত রোগীর মোট সংখ্যা এবং এ রোগে মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য জেলাভিত্তিক সরকারি সংখ্যা বর্তমানে প্রকাশ্যে পাওয়া যাচ্ছে না।
জনস্বাস্থ্যের জন্য এটিই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘাটতি। কারণ, রোগটির প্রকৃত বোঝা কতটা, কতজন চিকিৎসার আওতায় আছেন, কতজন নিয়মিত ফলোআপে রয়েছেন এবং কতজন সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারে পৌঁছেছেন— এসব জানা না থাকলে জেলার জন্য কার্যকর পরিকল্পনা করাও কঠিন।
বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২৪ কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি নিয়ে বসবাস করছেন। ওই বছর হেপাটাইটিস বি-তে আনুমানিক ১১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার বড় অংশ সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের কারণে। হেপাটাইটিস সি-তে ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ নিয়ে ছিলেন এবং আনুমানিক ২ লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হেপাটাইটিস বি মূলত আক্রান্ত মা থেকে শিশুর মধ্যে জন্মের সময়, শৈশবে, আক্রান্তের রক্ত বা শরীরের তরলের সংস্পর্শ, অনিরাপদ ইনজেকশন এবং ধারালো যন্ত্রের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। হেপাটাইটিস সি মূলত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। অনিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি, স্ক্রিনিং ছাড়া রক্ত, একই সুচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে সংক্রমণ হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ তাদের প্রকাশিত তথ্যে হেপাটাইটিস বি-এর সংক্রমণ প্রায় ৪ থেকে ৭ শতাংশ এবং হেপাটাইটিস সি ১ থেকে ৩ শতাংশ হতে পারে বলে উল্লেখ করেছে।
শরীরে ভাইরাস আছে, জানেন না অনেকেই
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অরুণ জ্যোতি তারাফদার বলেন, হেপাটাইটিস বি ও সি নিয়ে বাংলাদেশে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অনেক মানুষ আক্রান্ত বা বাহক হলেও তা জানেন না।
তিনি বলেন, হেপাটাইটিস শনাক্ত হলে চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হলে নিয়মিত ফলোআপের প্রয়োজন হয়। তার মতে, হেপাটাইটিস সি-এর ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসায় রোগীর সুস্থ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর হেপাটাইটিস বি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত চিকিৎসা ও ফলোআপ গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসার খরচও কম নয়
হেপাটাইটিস শনাক্ত করার খরচ রোগীর অবস্থা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়।
ময়মনসিংহ নগরের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের ওই বাসিন্দার অভিজ্ঞতায়, শুধু রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেই প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষায় তার খরচ হয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। নিয়মিত ওষুধ ও ফলোআপের খরচ এর বাইরে।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা থাকলেও চাপ বেশি
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ময়মনসিংহ বিভাগের একটি তৃতীয় স্তরের রেফারেল হাসপাতাল। ময়মনসিংহ বিভাগ ও আশপাশের এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালটিতে আসেন। বর্তমানে এখানে ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা ও জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধাও রয়েছে।
কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে স্ক্রিনিং ছাড়া রক্ত দেওয়া হচ্ছে— এমন নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। রক্ত সঞ্চালনের আগে প্রয়োজনীয় মৌলিক স্ক্রিনিং করা উচিত। এসব পরীক্ষা খুব বেশি ব্যয়বহুল নয় এবং অনুমোদিত সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও করা সম্ভব।
বেসরকারি পর্যায়ে ময়মনসিংহ শহরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও বিভিন্ন লিভার-সংক্রান্ত পরীক্ষা করার সুযোগ রয়েছে। ফলে রোগীরা সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যবস্থার ওপরও নির্ভর করছেন।
তবে চিকিৎসার সুযোগ থাকা আর সবার জন্য তা আর্থিকভাবে সহজলভ্য হওয়া এক বিষয় নয়। ওই ব্যক্তির মতো রোগীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত পরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত এবং স্বজনের সময়— সবমিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
হেপাটাইটিস সি এখন নিরাময়যোগ্য
হেপাটাইটিস বি ও সি একই ধরনের রোগ নয়। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও রয়েছে পার্থক্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হেপাটাইটিস সি-এর সরাসরি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ডিএএ ব্যবহার করে ৯৫ শতাংশের বেশি রোগীকে নিরাময় করা সম্ভব। তবে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার সুযোগ এখনো অনেকের নাগালের বাইরে। অন্যদিকে, হেপাটাইটিস বি-এর বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রোগীর জন্য অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে এবং নিয়মিত লিভার পরীক্ষা ও ফলোআপ করতে হয়।
রোগীর স্বজনদের অনেকেই জরুরি মুহূর্তে শুধু রক্তের গ্রুপ মেলানো হয়েছে কি না, সেটিই জানতে চান। রক্তটি কোথায় পরীক্ষা হয়েছে, সংক্রমণ স্ক্রিনিং হয়েছে কি না, কোন ব্লাড ব্যাংক থেকে এসেছে— এসব প্রশ্ন তুলনামূলক কম করা হয়।
অর্থাৎ হেপাটাইটিস ধরা পড়া মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তবে দেরিতে শনাক্ত হলে রোগটি সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর ও লিভার ক্যানসারে গড়াতে পারে।
শেষ পর্যায়ে লিভার প্রতিস্থাপন
দীর্ঘদিন হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এমনকি পরিস্থিতি জটিল হয়ে একপর্যায়ে রোগীর লিভার প্রতিস্থাপনেরও (ট্রান্সপ্লান্ট) প্রয়োজন পড়ে।
ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মতে, হেপাটাইটিস বি ও সি-এর কারণে সৃষ্ট অ্যাডভান্সড সিরোসিস এবং শেষ পর্যায়ের লিভার রোগের ক্ষেত্রে একমাত্র কার্যকর সমাধান হিসেবে লিভার প্রতিস্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশেও এখন সফলভাবে লিভার প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। বারডেমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকেই বাংলাদেশ লিভার ট্রান্সপ্লান্ট প্রদানকারী দেশগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং সফলভাবে লিভার প্রতিস্থাপনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
রক্তদানে আগ্রহ, পরীক্ষায় অনীহা
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অতীত কার্যক্রম পর্যালোচনা করলেও বিশ্ব রক্তদাতা দিবস উপলক্ষে নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচির নজির চোখে পড়ে। যেমন—২০২৩ সালের ১৪ জুন হাসপাতালের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের উদ্যোগে পালিত হয়েছিল বিশ্ব রক্তদাতা দিবস।
তবে কাগজ-কলমে সচেতনতা কার্যক্রম থাকলেও রোগী ও রক্তদাতাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলছে। রক্ত দেওয়া বা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়লেও, রক্ত কতটা নিরাপদ বা জীবাণুমুক্ত— তা যাচাইয়ের বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েই গেছে।
জরুরি চিকিৎসার মুহূর্তে রোগীর স্বজনেরা কেবল রক্তের গ্রুপ মিলল কি না, তা নিয়েই বেশি চিন্তিত থাকেন। সংগৃহীত রক্তটি যথাযথভাবে পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং করা হয়েছে কি না কিংবা কোনো মানসম্মত ব্লাড ব্যাংক থেকে এসেছে কি না— এমন জীবনরক্ষা সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো এখনো তুলনামূলক উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।
অভিযোগের তদন্ত চান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা
রক্তের নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফয়সল আহ্মেদ বলেন, কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে স্ক্রিনিং ছাড়া রক্ত দেওয়া হচ্ছে— এমন নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। রক্ত সঞ্চালনের আগে প্রয়োজনীয় মৌলিক স্ক্রিনিং করা উচিত। এসব পরীক্ষা খুব বেশি ব্যয়বহুল নয় এবং অনুমোদিত সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও করা সম্ভব।
‘যদি কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে শুধু রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে কোনো ধরনের স্ক্রিনিং ছাড়া রক্ত সঞ্চালন করা হয়, তাহলে বিষয়টি আমাদের জানানো প্রয়োজন। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। কোথায়, কোন প্রতিষ্ঠানে এবং কীভাবে ঘটনা ঘটছে— এসব তথ্য প্রয়োজন।’
রক্তের কালোবাজারি সম্পর্কে তিনি বলেন, ময়মনসিংহে বড় ধরনের কোনো ঘটনা নজরে আসেনি। তবে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকেন্দ্রিক কিছু অভিযোগ এসেছিল। অভিযোগগুলো তদন্তে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার প্রয়োজন হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রোগীর ভোগান্তি ও পরিবারের ওপর চড়া মাশুল
হেপাটাইটিসের ধাক্কা কেবল রোগীর শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পুরো পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে তছনছ করে দেয়। ভুক্তভোগী যুবকের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট— রোগ শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই প্রতিটি পদক্ষেপে স্বজনদের সার্বক্ষণিক পাশে থাকতে হয়েছে। নিয়মিত হাসপাতাল দৌড়ঝাঁপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বহুমূল্যের ওষুধ ও চিকিৎসকের ফি মেটাতে গিয়ে পরিবারটির ওপর ভর করেছে অর্থ ও সময়ের এক পাহাড়সম চাপ।
এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, হেপাটাইটিসের প্রকৃত মাশুল কেবল চিকিৎসার রশিদ বা ওষুধের দাম দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব। এর সঙ্গে যুক্ত হয় স্বজনদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, যাতায়াত খরচ, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার অনিশ্চয়তা। তাই মূল প্রশ্নটি কেবল ‘কতজন আক্রান্ত’ তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বড় প্রশ্ন হলো— কতজন নিজের আক্রান্ত হওয়ার খবর জানেন, কতজন নিয়মিত সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন এবং রক্ত সঞ্চালনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ন্যূনতম মান আদৌ নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না।
ময়মনসিংহের এই চিত্র একটি বড় ও কঠিন বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে— হেপাটাইটিস হয়তো নীরবে শরীরে বাসা বাঁধে, কিন্তু এর চিকিৎসার চাপ মোটেও নীরব থাকে না। রোগীর পাশাপাশি পুরো পরিবারকে নিঃশব্দে বহন করতে হয় সেই বোঝার মাশুল। আর এই প্রাণঘাতী রোগ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে জরুরি হলো— সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ চিকিৎসা সুগম করা। সূত্র : ঢাকা পোস্ট।






