সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অথচ বছরের প্রায় ছয় মাসই হাঁটুপানির নিচে তলিয়ে থাকে মাঠ। নেই খেলাধুলার সুযোগ, নেই স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ। জলাবদ্ধতায় এক ভবন পরিত্যক্ত হয়ে ভেঙে ফেলতে হয়েছে, অবশিষ্ট ভবনও আর্দ্রতায় ক্ষতিগ্রস্ত। শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে গাদাগাদি করে ক্লাস করছে, আর অভিভাবকরা সন্তানদের অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নিচ্ছেন। দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগেও কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় স্থানীয় শিক্ষা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ত্রিশাল উপজেলার বৈলর মঠবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে এমনই চিত্র দেখা যায়।
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগেও বর্ষার পানি দুই-তিন দিনের মধ্যে নেমে যেত। কিন্তু স্থানীয় এক ব্যক্তি পাশের জমি ও সড়ক-জনপথ বিভাগের জায়গার অংশ খনন করে মাছের পুকুর করায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই বর্ষা শেষ হলেও মাসের পর মাস মাঠ, বিদ্যালয় চত্বর ও আশপাশের বসতবাড়িতে পানি জমে থাকে।
জলাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয়ের একটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ভেঙে ফেলতে হয়েছে। বর্তমানে কক্ষসংকটে এক কক্ষেই দু’টি শ্রেণির পাঠদান চলছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মধ্যাহ্ন বিরতিতে শিশুরা মাঠে নামতে না পেরে মহাসড়কের পাশে ছোটাছুটি করছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। বাথরুমে যেতে হচ্ছে বালুর বস্তার ওপর দিয়ে। চারপাশে জমে থাকা পানির কারণে মশার উপদ্রব ও দুর্গন্ধে নাজেহাল শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনের দেয়ালও স্যাঁতসেঁতে হয়ে ক্ষয় হতে শুরু করেছে।
প্রধান শিক্ষক তাহমিনা আক্তার জানান, মাঠে মাটি ভরাট ও পানি নিষ্কাশনের দাবিতে একাধিকবার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত ও মৌখিক আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, গত বছর মাটি ভরাটের জন্য এক লাখ টাকার বরাদ্দ এলেও তার অল্প অংশের কাজ হয়েছে। ফলে সমস্যার কোনো বাস্তব সমাধান হয়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পরিবেশের কারণে ধারাবাহিকভাবে কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ২০২৪ সালে যেখানে শিক্ষার্থী ছিল ২২৩ জন, ২০২৫ সালে তা কমে ২১৬ জন এবং চলতি বছর নেমে এসেছে মাত্র ১৬৫ জনে।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া, নওরিন, জুনাইদ এবং চতুর্থ শ্রেণির রাহাত, সানজিদা, ফাউজিয়া ও ইসরাত জানায়, মাঠে পানি থাকায় তারা খেলাধুলা করতে পারে না। সারাদিন শ্রেণিকক্ষে বসে থাকতে ভালো লাগে না। তাদের অভিযোগ, আমাদের কষ্ট কেউ দেখে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শুধু নিজের জমিই নয়, সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গাও খনন করেছেন। পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়াতেই এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে অভিযুক্ত সেলিম মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘পুকুর থেকে পাইপ দিয়ে পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সামনে বাধা থাকলে সেটি তার দায় নয়।’
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিলুফার হাকিম জানান, মাঠে মাটি ভরাট করে উঁচু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে মাঠ উঁচু করার কাজ করা হবে।’
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—যে বিদ্যালয়ের মাঠ বছরের অর্ধেক সময় পানির নিচে থাকে, যেখানে শিশুদের খেলাধুলা বন্ধ, ভবন ক্ষতিগ্রস্ত, শিক্ষার্থী কমছে—সেই সংকট নিরসনে কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ আসতে এত বছর লাগছে কেনো?







