ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় কেয়ারটেকার ও চাচাতো ভাই নিখোঁজের ৯দিন পর কাস্টমস কর্মী রাকিব রায়হান তালুকদারের (৪০) ১৫ টুকরা লাশ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, টাকার লোভে বাড়ির ভেতরেই তাকে হত্যা করা হয়। পরে গরু কাটার কাজে ব্যবহৃত কাঠের ‘খাইট্টা’য় লাশটি টুকরা টুকরা করে চারটি ট্রাভেল ব্যাগে ভরে বাড়ির পাশের পরিত্যক্ত পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় বাড়ির কেয়ারটেকার রাজু মির্জা ও তার চাচাতো ভাই জিতুলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ভোর ৫টার দিকে সিলেটের শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশন থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। বুধবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতি, লোহার রড, তিনটি ছুরি, কাঠের খাটিয়া ও রক্তমাখা পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে রাকিবের বাড়ি থেকে। ত্রিশাল সার্কেলের এএসপি এস এম হাসান ইস্রাফীল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাকিব রায়হান তালুকদার ঢাকার কমলাপুর কাস্টমস শাখার নিরাপত্তা শাখায় সিপাহি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকলেও প্রতি বৃহস্পতিবার ফুলবাড়ীয়ার সোয়াইতপুর গ্রামের বাড়িতে আসতেন এবং শনিবার ভোরে কর্মস্থলে ফিরে যেতেন।
গত ২৩ জুলাই তিনি বাড়িতে আসেন। ওই রাতে বড় ভাই নূরুল ইসলামের সঙ্গে তার শেষবার কথা হয়। পরদিন ২৪ জুলাই বিকেল থেকে নিখোঁজ হন তিনি। দীর্ঘ সময় তার কোনো সন্ধান না পেয়ে ২৭ জুলাই রাতে ফুলবাড়ীয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন বড় ভাই নূরুল ইসলাম।
জিডি করার পরপরই বাড়ির কেয়ারটেকার রাজু মির্জা ও তার চাচাতো ভাই জিতুল গা-ঢাকা দেয়। শুরু থেকেই পরিবারের সদস্যদের সন্দেহের তালিকায় ছিল রাজু। পরে পুলিশি অনুসন্ধানে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসে।

অবশেষে গত ২ আগস্ট ফুলবাড়ীয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের সোয়াইতপুর গ্রামে রাকিবের বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরের একটি পরিত্যক্ত পুকুরে অভিযান চালিয়ে চারটি ট্রাভেল ব্যাগ উদ্ধার করে পুলিশ। ব্যাগগুলো খুলতেই বেরিয়ে আসে রাকিবের খণ্ড-বিখণ্ড লাশ। তার লাশ ১৫ টুকরা করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানায়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যার পর লাশ টুকরা করার কাজে ব্যবহার করা হয় কাঠের তৈরি মাংস কাটার খাটিয়া বা স্থানীয় ভাষায় ‘খাইট্টা’। পরে লাশের খণ্ডগুলো ব্যাগ ও বিছানার চাদরে মুড়িয়ে পরিত্যক্ত পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামতও রাকিবের বাড়িতে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল।
ত্রিশাল সার্কেলের এএসপি এস এম হাসান ইস্রাফীল বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, টাকার লোভেই রাকিবকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর অভিযুক্তরা আত্মগোপনে চলে যায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি কক্সবাজার এলাকাতেও তারা অবস্থান করেছিল বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করে শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশন থেকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, গ্রেফতার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, অর্থের লেনদেন এবং হত্যার সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
নিহত রাকিব রায়হান তালুকদার সোয়াইতপুর গ্রামের মৃত ছিদ্দিক তালুকদারের ছেলে। তার মা রাহেলা খাতুন। তিনি বিবাহিত ছিলেন; কয়েক বছর আগে স্ত্রীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়।
একজন কাস্টমস কর্মীকে নিজ বাড়িতে হত্যার পর লাশ ১৫ টুকরা করে গোপনে পুকুরে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের তদন্তে এখন বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় রয়েছে হত্যার নেপথ্যের পুরো কাহিনী।







