আগের মাসগুলোর মতো ২০২৬ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য কর্মপরিবেশ ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকরা শারীরিক হামলা, হয়রানিমূলক মামলা, প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছে। দেশের মূল ধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে সংগৃহীত তথ্য ও নিজস্ব সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই মাসে অন্তত ৬৪ জন সংবাদকর্মী বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে কেন্দ্র করে সাইবার হামলার শিকারও হয়েছে একটি গণমাধ্যম।
শারীরিক হামলা ও আঘাত
জুলাই মাসে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, কিশোর গ্যাং এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে ২৯ টি ঘটনায় অন্তত ৩৭ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের হাতে সাংবাদিক হেনস্তা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের লাঠিচার্জে আহত দুই সাংবাদিক, যবিপ্রবিতে খেলা দেখার ভিডিও করায় তিন সাংবাদিক লাঞ্ছিত এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের শিক্ষার্থীদের হামলায় চার সাংবাদিক আহত ও মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া নাঙ্গলকোটে সাংবাদিকের কার্যালয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলা ও পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি, ফেনীর ছাগলনাইয়ায় সাংবাদিককে পিটিয়ে নদীতে ফেলে হত্যাচেষ্টা, কুয়াকাটায় ছাত্রদল-যুবদল নেতাদের হাতে সাংবাদিককে হাতুড়িপেটা এবং বেনাপোলে সন্ত্রাসী বাহিনীর হামলায় সাংবাদিকের মাথা থেঁতলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া খুলনায় রাতে আড্ডারত সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তদের গুলিবর্ষণে এক সাংবাদিক আহত হন।
আইনি হয়রানি
সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করতে মানহানি, চাঁদাবাজি ও নাশকতার মামলাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। গত মাসে অন্তত ১২ সংবাদকর্মী আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য: কুমিল্লার মুরাদনগরে বিএনপি নেতার এক হাজার কোটি টাকার মানহানি মামলায় এক সাংবাদিক গ্রেপ্তার এবং আগৈলঝাড়ায় থানা ভাঙচুরের মিথ্যা মামলায় দুই সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। গাজীপুরে সরকারি জমি দখলের সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিক ও তাঁর বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। রংপুরে সিআইডি কর্মকর্তার অনিয়মের তথ্য চাওয়ায় সাংবাদিকের নামে জিডি করা হয়েছে। কোটালীপাড়ায় অনিয়মের সংবাদ করায় মামলা দিলেও পরে তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ঠিকাদার।
হুমকি, হেনস্তা ও পেশাগত কাজে বাধা
জুলাই মাসে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হুমকি, হেনস্তা ও বাধার সম্মুখীন হন ১৫ সাংবাদিক।
উল্লেখযোগ্য: কুমিল্লার লালমাইয়ে বিএনপি নেতার অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, দিনাজপুরের হিলিতে সাংবাদিককে 'স্যার' বলতে বাধ্য করার চেষ্টা এবং শরিয়তপুরের নড়িয়ায় সাংবাদিককে 'দেখে নেওয়ার' হুমকি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পঞ্চগড়ে ব্যাংক কর্মকর্তার মাধ্যমে সাংবাদিককে এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা এবং বারহাট্টায় উপজেলা চত্বরে সাংবাদিককে হেনস্তা ও তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সাইবার হামলার শিকার গণমাধ্যম
প্রতিমন্ত্রীর ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ে সংবাদ প্রচার করায় 'চ্যানেল ওয়ান'-এর ফেসবুক পেজে ভয়াবহ সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নিয়ে করা একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর চ্যানেল ওয়ানের ফেসবুক পেজ থেকে তা গায়েব হয়ে গেছে। বেসরকারি চ্যানেলটির কর্তৃপক্ষের দাবি, ভুয়া কপিরাইট ক্লেইম ও পরিকল্পিত রিপোর্টের মাধ্যমে ফেসবুক থেকে তাদের প্রতিবেদনটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।সাংবাদিকদের ওপর চলমান এই আক্রমণ ও আইনি হয়রানি মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য এক অশনি সংকেত বলে মনে করে বিএজে । রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বা পেশী শক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিএজে অবিলম্বে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে। সূত্র : প্রেস বিজ্ঞপ্তি।
সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিএজে-এর মাসিক প্রতিবেদন
এক মাসে হামলা, মামলা ও হুমকির শিকার ৬৪ সংবাদকর্মী
• শারীরিক হামলা ও আঘাতের শিকার ৩৭ • আইনি হয়রানির শিকার ১২ • হুমকি, হেনস্তা ও পেশাগত কাজে বাধার সম্মুখীন ১৫
জাতীয়সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬








