বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা এখন আর শুধু স্টেডিয়াম কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই। এই খেলার জোয়ার এখন বাংলাদেশের ফ্যাশন বাজারেও আছড়ে পড়েছে, যার ফলে দিন দিন বাড়ছে ফুটবল থিমের শাড়ির জনপ্রিয়তা।
‘স্বপ্ন যাত্রা’র স্বত্বাধিকারী রাজন কুমার মজুমদার জানান, শাড়ির নকশায় আর্জেন্টিনার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই আর্জেন্টিনার দখলে, আর এর পরেই রয়েছে ব্রাজিলের অবস্থান। তিনি বলেন, চার বছর আগে গত বিশ্বকাপের সময় তাদের প্রতিষ্ঠান প্রথমবার পতাকার থিমে শাড়ি তৈরি করে বাজারে এনেছিল। তখন সেগুলো ক্রেতাদের মাঝে বেশ ভাল সাড়া ফেলেছিল। শুরুতে কেবল আর্জেন্টিনার নকশায় শাড়ি তৈরি করা হলেও পরে ক্রেতাদের প্রবল আগ্রহের কারণে ব্রাজিলের ডিজাইনের শাড়িও তালিকায় যুক্ত করা হয়।
রাজন আরও জানান, এই মৌসুমী ব্যবসায় সাধারণত ২০ শতাংশের মতো লাভ থাকে। তাদের শাড়ির ক্রেতাদের প্রায় ৪০ শতাংশ ঢাকার, ৩০ শতাংশ ঢাকার বাইরের এবং বাকি ৩০ শতাংশ প্রবাসী। চার বছর আগে এসব শাড়ি প্রায় আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হলেও, এবার দাম রাখা হচ্ছে দুই হাজার টাকার নিচে। বর্তমানে বিক্রি মাঝারি ধরনের হলেও বিশ্বকাপ যত সামনে এগোবে, শাড়ির চাহিদাও তত বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।
‘হরিতকী’ নামের আরেকটি অনলাইন শপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অনিক কুন্ডু জানান, বিশ্বকাপ থিমের শাড়ি ক্রেতাদের বেশ নজর কাড়ছে। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত তাদের ৫০০টিরও বেশি শাড়ি বিক্রি হয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৫০টি শাড়ির অর্ডার আসছে। তাদের মোট বিক্রির ৫৫ শতাংশ আর্জেন্টিনার, ৪০ শতাংশ ব্রাজিলের এবং বাকি ৫ শতাংশ অন্যান্য দলের থিমযুক্ত শাড়ি।
এসব শাড়ির বেশিরভাগ ক্রেতাই পুরুষ, যারা প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার জন্য এগুলো কিনছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও শাড়ির অর্ডার দিচ্ছেন। ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও এর চাহিদা ঢাকার মতোই সমান তালে চলছে। বর্তমানে এসব শাড়ি বিশেষ ছাড়ে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বিশ্বকাপ শুরু হলে এর দাম বেড়ে ১৬৯০ টাকা হবে। ‘স্বপ্ন যাত্রা’ নিজস্ব কারখানায় এই পণ্যগুলো তৈরি করে এবং খেলা শুরুর সাথে সাথে বিক্রি আরও বাড়বে বলে তারা মনে করছেন।
স্থানীয় অনলাইন বুটিক ‘শাড়ি ঘর’ এই নতুন ধারার অন্যতম পথিকৃৎ। এর মালিক হেদায়েত সাজিদ জানান, তাদের দোকানে আর্জেন্টিনার পাশাপাশি ‘সেভেন-আপ’ থিমের শাড়িও আনা হয়েছে, যা মূলত ব্রাজিল সমর্থকদের নিয়ে কিছুটা মজার ছলেই তৈরি করা। আরামদায়ক হওয়ার কারণে জার্সি ভক্তদের প্রধান পছন্দ হলেও, সাজিদ শাড়িকে ফ্যাশনের একটি দারুণ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছেন।
সাজিদ বলেন, ‘খেলা যত জমজমাট হবে, এই বিশেষ শাড়ির চাহিদাও তত লাফিয়ে বাড়বে।’ বর্তমানে তাদের দোকানে ব্রাজিলের চেয়ে আর্জেন্টিনার শাড়ি বেশি বিক্রি হচ্ছে। তারা ‘ক্লাসি’ নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জার্সিও বিক্রি করেন, তবে তাদের মূল লক্ষ্য নারী সমর্থকদের এই বিশেষ শাড়ি পরতে উৎসাহিত করা।
অর্ডারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঢাকার বাইরে এই শাড়ির চাহিদা ব্যাপক। মোট অর্ডারের মাত্র ৩০ শতাংশ ঢাকা থেকে আসে, আর ৭০ শতাংশ আসে ফেনী, সিলেট ও লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে। বাকি ২০ শতাংশ অর্ডার আসে বিদেশ থেকে, যার বড় অংশই উপহার দেওয়ার জন্য প্রবাসীদের কেনা।
যদিও এটি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির বাজার, তবুও নতুন ও পুরোনো ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে নিয়মিত উৎপাদন চলছে। এতে লাভের হার ২০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে থাকে। প্রায় দেড় মাসব্যাপী এই টুর্নামেন্ট জুড়ে চাহিদা বজায় থাকবে ধরে নিয়ে ‘শাড়ি ঘর’ আরও নতুন নতুন ডিজাইনের শাড়ি বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে।
বর্তমানে বিশ্বকাপ থিমের এসব শাড়ি মূলত অনলাইনে ফরমায়েশ অনুযায়ী বা কাস্টমাইজড ডিজাইনে বিক্রি হচ্ছে। এই বাজারে ভ্যালোরেক্স, স্যাভেজন, ফিটফ্রিক বিডি, ড্রিম জার্সি বিডি, জার্সি ওয়েভ বিডি, জার্সি ডট কম ডট বিডি, জার্সি জাংশন বিডি, জার্সি ক্লাব বিডি এবং জার্সি অ্যাডিক্সের মতো ১০ থেকে ১৫টি অনলাইন জার্সি প্ল্যাটফর্ম বেশ সক্রিয়।
এর পাশাপাশি অনেক খুচরা বিক্রেতাও তাদের শোরুম ও অনলাইন মাধ্যমের সাহায্যে জার্সি বিক্রি করছেন, যা সব ধরনের ক্রেতাদের কাছে এসব পণ্য সহজেই পৌঁছে দিচ্ছে।
‘ব্র্যান্ড আউটলেট’-এর মালিক রাজ আহমেদ জানান, বিশ্বকাপের এই মৌসুম তাদের ব্যবসার পালে হাওয়া দেয়। অনলাইন প্রসারের যুগেও তাদের মোট বিক্রির ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ সরাসরি দোকান বা শোরুম থেকেই হয়। এই ব্যবসায় লাভের মুখ দেখা যায় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। তাদের ক্রেতাদের মধ্যে নারী ও পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান, অর্থাৎ অর্ধেক পুরুষ এবং অর্ধেক নারী।
‘জার্সি গ্র্যান্ড’-এর অনলাইন বিক্রেতা রাকিব হাসান তুহিন বলেন, বড় কোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট এলে জার্সি বিক্রি বহুগুণ বেড়ে যায়। সাধারণ সময়ে দিনে যেখানে ৫-৬টি জার্সি বিক্রি হতো, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০-১২টিতে। বরাবরের মতো আর্জেন্টিনার জার্সির আধিপত্য থাকলেও নেইমারের কারণে ব্রাজিলের জার্সির চাহিদাও বেশ বেড়েছে।
তাদের বেশিরভাগ অর্ডার আসে ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে, বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম ও কুষ্টিয়া অঞ্চল থেকে। এসব জার্সি চীন থেকে আমদানি করা হয়, যার বাজারমূল্য ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে। এতে লাভ থাকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ।
শেখ রাফিদ নামের এক ক্রেতা জানান, বড় টুর্নামেন্টের সময় জার্সি কেনাটা প্রিয় দল ও প্রিয় খেলোয়াড়দের প্রতি সমর্থন জানানোর একটা চমৎকার উপায়। তার মতে, জার্সি গায়ে দিলে বিশ্বকাপ দেখার আনন্দ বহুগুণ বেড়ে যায়। ফুটবল ভক্তদের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী এবং তারকা খেলোয়াড়দের প্রতি ভালোবাসার টানেই মূলত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
সব মিলিয়ে, এবারের বিশ্বকাপের মৌসুম ক্রেতাদের মাঝে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। এখানে কেনাকাটার পেছনে কেবল ফ্যাশন নয়, বরং জড়িয়ে আছে এক বুক আবেগ, দলের প্রতি ভালোবাসা এবং হৃদয়ের গভীর টান।







