গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ও পেশাগত মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, গণমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতৈক্যের ভিত্তিতে একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য কমিশন গঠন করা গেলে দেশে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

আজ রাজধানীর তথ্য ভবনের ডিএফপি সম্মেলন কক্ষে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত বাকশালী শাসনে সংবাদপত্র বন্ধের কালো দিবস উপলক্ষে "ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় মিডিয়ার বর্থ্যতা" শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম খাতের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় নীতি ও আইন প্রণয়ন, অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ, পেশাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধি এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষায় একটি স্বাধীন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। সে কারণে এটিকে অবশ্যই নিখুঁত হতে হবে। কিন্তু গণমাধ্যমকে নিখুঁত করে গড়ে তোলার দায়িত্বও গণমাধ্যমকেই পালন করতে হবে। এজন্য সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দাঁড়াতে না পারলে ভবিষ্যতেও একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা যাবে না।
তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। ফলে দেশে একটি শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় গণমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, ট্রেড ইউনিয়ন, প্রেস ক্লাবসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না হিসেবে কাজ করে। তাই এ প্রতিষ্ঠানকে আরও নির্ভুল, দায়িত্বশীল ও পেশাদার করে তুলতে হবে। গণমাধ্যম-সংক্রান্ত যেকোনো সংস্কার কার্যক্রম সফল করতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণ ও মতৈক্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ভিন্নমতের সহাবস্থান গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের পেছনে ভিন্নমতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধারণ ও চর্চা করতে না পারার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করেছে। তাই মতের বৈচিত্র্যকে সংঘাতের পরিবর্তে প্রগতির শক্তিতে রূপান্তর করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

আলোচনায় তিনি উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ তুলে ধরেন। যুক্তরাজ্যের অফকম , যুক্তরাষ্ট্রের এফসিসি এবং ইউরোপের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মতো একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যেমন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়, তেমনি দায়িত্বশীলতার সীমারেখাও নির্ধারিত থাকে।
মন্ত্রী জানান, এরই মধ্যে গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। সবার বক্তব্যে একটি স্বাধীন ও কার্যকর গণমাধ্যম কমিশন গঠনের বিষয়ে ব্যাপক মিল পাওয়া গেছে। এই ঐকমত্যকে ভিত্তি করে একটি টেকসই ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এ উদ্যোগে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা গেলে এটি গণমাধ্যম খাতের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কার্যকর অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করবে।
বক্তৃতার শেষাংশে তিনি ১৯৭৫ সালে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে স্বাধীন ও প্রাতিষ্ঠানিক গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বহুমতের চর্চাকে আরও শক্তিশালী করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের যুগ্ম আহ্বায়ক দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সভাপতিত্বে যুগান্তর সম্পাদক কবি আব্দুল হাই শিকদারের পরিচালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান।
সেমিনারে আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন নয়া দিগন্ত'র সম্পাদক সালাহউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক কালের কণ্ঠ সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ, দৈনিক ওয়াদা'র সম্পাদক অন্তবর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে'র মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, দৈনিক নিউ নেশানের সম্পাদক মোকাররম হোসেন, দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, দৈনিক বাংলাদেশের খবরের সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন্দ, পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান, খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রাশিদুল ইসলাম এবং সাংবাদিক ইউনিয়ন ময়মনসিংহের সাধারণ সম্পাদক দৈনিক নিউ টাইমস সম্পাদক সাইফুল ইসলাম।

আমার দেশ সম্পাদক ও এনইসির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, মিডিয়ায় ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মূল ধারায় ফেরার সুযোগ রয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডকে যারা জায়েজ করেছেন, সহযোগিতা করেছেন, তাদের ছাড় দেওয়া চলবে না, ফৌজদারি আইনে তাদের বিচার করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা মিডিয়াকে কোটারিমুক্ত করে এটাকে জাতীয় চরিত্র দিতে চাই। এজন্য আমাদের সংগঠনের নাম ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল দিয়েছি এবং এতে প্রথমবারের মত ঢাকার বাইরের সম্পাদকরাও আছেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, আমরা মিডিয়ার প্রকৃত স্বাধীনতা চাই। অর্থাৎ আমার মতটা যাতে আমি প্রকাশ করতে পারি। আপনার যদি আমার মত পছন্দ না হয়, তাহলে আপনি লিখে আমার মতের প্রতিবাদ করবেন। তবে আমার কণ্ঠরোধ করবেন না। এটাই আমাদের চাওয়া। এটাই মিডিয়ার প্রকৃত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা করতে হলে আমাদের অন্তত এই ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
বিএফইউজে'র সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন, সাংবাদিকদের কণ্ঠ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না। আমরা অতীতের মতো আর কোনো এক্সপেরিমেন্ট চাই না।
বিএফইউজে' মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেন, বিগত সরকারের আমলে এমন কোনো দিন যায়নি যে সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতন হয়নি। দলীয় ক্যাডার ও সাংবাদিকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। শেখ হাসিনার আমলে সংবাদ সম্মেলনে সম্পাদকদের ভুমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেই সব দাস সম্পাদকদের প্রতি ঘৃণা। এরা সাংবাদিকদের মান-মর্যাদা ম্লান করে দিয়েছেন। শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার থেকে মহাস্বৈরাচার বানাতে ওই সাংবাদিকরাই দায়ী। দলদাস সম্পাদক ও সাংবাদিকদের এমন আত্মসমর্থন মানুষ মেনে নেয়নি। ফ্যাসিবাদের দোসরদের প্রতি ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।




