প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীতে এমন কিছু বিষয় রাখা হয়েছে, যেগুলোর অপপ্রয়োগের আশঙ্কা রয়েছে। বাতিল হওয়া বিতর্কিত ডিজিটাল আইনের গণমাধ্যমবিরোধী ধারার কিছু বিষয়বস্তুও এখানে যুক্ত করা হয়েছে। এতে গণমাধ্যম ভুক্তভোগী হতে পারে, যার উদাহরণ অতীতেও দেখা গেছে। এই অভিমত জানিয়ে গণমাধ্যমুসংশ্লিষ্ট শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা আইনটি সংশোধনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে আলাদা রাখা অথবা গণমাধ্যমের জন্য রক্ষাকবচ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে সরকারের পক্ষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা বলেছেন, এই আইন সংবাদপত্রের জন্য নয়। গণমাধ্যমকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়, একই সঙ্গে সমাজকেও কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়, তার মধ্যে ভারসাম্য রেখেই আইনটি করা হবে। আইনের অপপ্রয়োগ যেন না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনার জন্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশীজনদের সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সরকারের উদ্যোগে একটি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় গণমাধ্যমুসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা এ কথা বলেন।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই পরামর্শ সভায় সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি এবং সাংবাদিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গণমাধ্যমের শীর্ষস্থানীয়রা যা বললেন
আইনের অপপ্রয়োগের আশঙ্কার কথা তুলে ধরে বক্তব্য দেন ডেইলি স্টারের কনসালট্যান্ট এডিটর কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনে বলা হয়েছে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মামলা করবেন। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তিও মামলা করছেন এবং আদালত সেই মামলা গ্রহণ করছেন, আসামিরা জামিনও পাচ্ছেন। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ হলে পুলিশ এ ধরনের মামলা গ্রহণই করতে পারে না।
কামাল আহমেদ বলেন, তাঁর আশঙ্কা হচ্ছে, যতই কঠিন আইন করা হোক না কেন, সেটির অপপ্রয়োগ হলে ওই আইন করে কোনো লাভ হবে না। সুতরাং অপপ্রয়োগের ঝুঁকি কীভাবে বন্ধ করা যায়, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। শুধু সাজা বাড়ানোর দিকে নজর দিলে কিছুই হবে না।
প্রস্তাবিত আইনে মোবাইল কোর্টকে ক্ষমতায়নের কথা উল্লেখ করে কামাল আহমেদ বলেন, এতে আইনের অপপ্রয়োগের আশঙ্কা আরও বাড়বে। কারণ, এটি আর দশটি অপরাধের মতো নয়। এই অপরাধ মোবাইল কোর্ট দিয়ে মোকাবিলা করতে গেলে বিপদ আরও বাড়তে পারে।
সাংবাদিকদের ‘ঘরপোড়া গরু’র সঙ্গে তুলনা করে প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, সংবাদকর্মী হিসেবে আইনের অপপ্রয়োগে কীভাবে ভুক্তভোগী হতে হয়, তা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তাঁরা দেখেছেন।
মানহানি, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, অশ্লীল বিষয়বস্তু এবং সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্যসংক্রান্ত বিষয়ে প্রস্তাবিত আইনের ২৫ ও ২৬ নম্বর ধারার প্রসঙ্গ তুলে ধরে সাজ্জাদ শরিফ বলেন, অত্যন্ত কঠিন অপরাধের সঙ্গে মানহানিকে যুক্ত করা হচ্ছে। বিগত সময়ে এর ব্যাপক অপপ্রয়োগ হয়েছে। এখন এটিকে যুক্ত করা হলে বিষয়টি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা আছে।
প্রস্তাবিত আইনের ২৬ ধারায় অপতথ্যের ব্যাখ্যা অস্পষ্ট, ব্যাপক ও বিমূর্ত বলে মনে করেন সাজ্জাদ শরিফ। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমকে ভুক্তভোগী করার আশঙ্কা আছে। অতীতেও এর উদাহরণ রয়েছে। ফলে এসব বিষয় আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করা দরকার। একই সঙ্গে এখানে গণমাধ্যমের বিষয়টি কী হবে, সেটিও স্পষ্ট করা দরকার।







