দেশের একটি ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল বা এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট)-এ কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো ময়মনসিংহেও তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহনের ওপর। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চালকরা। এর প্রভাব পড়েছে যাত্রীসেবা ও স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থাতেও।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সরেজমিনে ময়মনসিংহ নগরী, সদর, ত্রিশাল, ভালুকাসহ জেলার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ স্টেশনেই স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি যানবাহনের চাপ। কোথাও শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি, আবার কোথাও গ্যাসের চাপ না থাকায় স্টেশনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। অনেক চালক ভোর থেকে দুপুর, এমনকি বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস নিতে পারেননি।

গ্যাস সংকটের কারণে অনেক চালক পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় রাস্তায় গাড়ি নামাতে পারছেন না। ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও যানবাহন পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক জামাল উদ্দিন বলেন, “গ্যাস সংকটের কারণে অনেক স্টেশন বন্ধ। বাধ্য হয়ে এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও আবার এত লম্বা লাইন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে গাড়ি চালানোর সময় কমে যাচ্ছে, আয়ও অর্ধেকে নেমে এসেছে।”
চালক শাহজাহান বলেন, “ভোর ৪টা থেকে কয়েকটি স্টেশনে ঘুরছি। কোথাও গ্যাস নেই, কোথাও বিশাল লাইন। এখন দুপুর ২টা বাজে, এখনও অপেক্ষা করছি। আজ যদি গ্যাস না পাই, তাহলে সারাদিন গাড়ি চালাতে পারব না। সংসারের খরচ চলবে কীভাবে বুঝতে পারছি না।”
ত্রিশালের চালক আমিনুল ইসলাম বলেন, “অনেকক্ষণ ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। সামনে অসংখ্য গাড়ি। কখন গ্যাস পাব, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রতিদিনের আয়ের ওপরই পরিবার চলে। দিনের অর্ধেক সময় যদি গ্যাসের লাইনে কাটে, তাহলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।”
ময়মনসিংহ সদরের চালক আলম মিয়া বলেন, “সকাল থেকে বিভিন্ন স্টেশনে ঘুরেও গ্যাস নিতে পারিনি। গাড়িতে থাকা সামান্য গ্যাসও শেষ হয়ে গেছে। গতকাল সারাদিনে মাত্র ২৫০ টাকা আয় করেছি। গ্যারেজের জমা, পরিবারের খরচ—সবকিছুই এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আজও যদি গ্যাস না পাই, তাহলে পুরো দিনের আয় নষ্ট হবে।”
ময়মনসিংহ জেলার কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা জানান, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় তারা স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করতে পারছেন না। অনেক স্টেশন সীমিত পরিসরে চালু থাকলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই গ্যাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে লাইনে থাকা অনেক চালক গ্যাস না নিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
একজন স্টেশনকর্মী বলেন, “গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় আমরা গ্রাহকদের গ্যাস দিতে পারছি না। এতে আমাদেরও কিছু করার নেই। ভোর থেকেই অসংখ্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহন স্টেশনের সামনে অপেক্ষা করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় অনেক চালককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই দুর্ভোগ কাটার সম্ভাবনা নেই।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মালিক বলেন, “দেশের একটি এফএসআরইউতে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। জাতীয় গ্রিড থেকেই পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না পাওয়ায় আমরা স্বাভাবিকভাবে গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ করতে পারছি না। এতে চালকদের দুর্ভোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি আমাদেরও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের নিজস্বভাবে করার কিছুই নেই। জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলেই কেবল পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটি হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর যেকোনো সমস্যাই জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি-এর ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী সত্যজিৎ ঘোষের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি জানান, তিনি বর্তমানে ব্যস্ত আছেন। পরে কোনো মন্তব্য না করেই ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে পরিবহন খাতের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় আরও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন চালক, স্টেশন মালিক ও ভুক্তভোগীরা।






