স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, একই সঙ্গে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ব্যয়, রাজনৈতিক চাপ, নৈতিক সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার দিকে নজর দিতে হবে।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর প্রথম প্লেনারি সেশনে বক্তারা একথা বলেন। বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে এই প্লেনারি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিধি, মান, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে মতবিনিময় হয়।
সেশনে মডারেটর হিসেবে ছিলেন বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম। আলোচনায় অংশ নেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম, টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক, পাকিস্তানের ডনের সম্পাদক জাফফার আব্বাস এবং যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ।
মাহফুজ আনাম বলেন, ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা। স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সম্ভব নয় এবং সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সম্পাদকদের ভূমিকা মুখ্য।’ তিনি বলেন, ‘অনেক সম্পাদক এখন মালিকপক্ষের পিআর বা মুখপাত্রে পরিণত হচ্ছেন। মালিক ও সম্পাদকের ভূমিকার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘একসময় দেশে শক্তিশালী সম্পাদকীয় নেতৃত্বের একটি ঐতিহ্য ছিল, কিন্তু গণমাধ্যমের রাজনৈতিককরণের কারণে সেই ধারা দুর্বল হয়ে গেছে। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়বদ্ধতা ও নৈতিক অবস্থানও আগের তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি তিনটি-সম্পাদকের স্বাধীন ভূমিকা, প্রতিষ্ঠানের নৈতিক মানদণ্ড এবং সাংবাদিকদের পেশার প্রতি অঙ্গীকার।’
টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নাইজেরিয়ায় অজ্ঞাত লাশ হিসেবে চিহ্নিত মৃতদেহ মেডিকেল কলেজে পাঠানোর ঘটনা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। প্রতিবেদনে বহু মৃতদেহে গুলির চিহ্ন পাওয়া যায় এবং সেগুলোর বড় অংশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত ব্যক্তিদের বলে সন্দেহ করা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘স্পেনে এক সাংবাদিকের অনুসন্ধানে একজন প্রভাবশালী রাজনীতিকের ভুয়া মাস্টার্স ডিগ্রির তথ্য প্রকাশিত হলে তা বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারিতে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত ওই রাজনীতিক পদত্যাগে বাধ্য হন।’
বাংলাদেশের উদাহরণ হিসেবে তিনি সংসদ সদস্য তামান্না নুসরাতের হয়ে অন্যদের পরীক্ষা দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি ছিল জবাবদিহিমূলক সাংবাদিকতার শক্তিশালী উদাহরণ, যেখানে টেলিভিশন অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ পেয়েছিল।’
মেক্সিকোর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে মাইকেল কুক বলেন, এক সাংবাদিক দেশটির প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীর বিলাসবহুল বাড়ির তথ্য প্রকাশ করেন, যা এক সরকারি ঠিকাদারের মালিকানাধীন ছিল। ওই ঠিকাদার সরকারের কাছ থেকে বড় বড় প্রকল্প পেয়েছিল। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতি, স্বার্থের সংঘাত এবং ক্ষমতার অপব্যবহার সামনে নিয়ে আসে।’
যমুনা টিভির চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ফাহিম আহমেদ, ‘বর্তমানে সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি ভয়ভীতি কিছুটা কমলেও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ব্যয়বহুল হলেও এটিই সংবাদমাধ্যমকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।’ তিনি বলেন, ‘অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দুর্নীতি উন্মোচন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত, আইন সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’





