নেত্রকোনার মদনে ১১ বছরের মাদরাসা শিক্ষার্থী অন্তঃসত্ত্বার ঘটনায় অভিযুক্ত হযরত ফাতেমা তুজ্জহুরা মহিলা কওমি মাদ্রাসার পরিচালক আমানউল্লাহ মাহমুদী সাগরকে আটক করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)| বুধবার (৬ মে) দুপুর ১২টায় ময়মনসিংহ নগরীর র্যাব-১৪ এর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংএ র্যাব অধিনায়ক নয়মুল হাসান এ খবর নিশ্চিত করে জানান, বুধবার ভোররাত সোমায় চারটার দিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে তাকে আটক করা হয়| আসামিকে নেত্রকোনা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও জানান তিনি|
প্রেস ব্রিফিংএ র্যাব অধিনায়ক নয়মুল হাসান জানান, গত ২৩ এপ্রিল বাদীর দায়েরকৃত এজাহারের বিবরণে জানা যায় যে, ধৃত অভিযুক্ত আমানুল্লাহ মাহমুদী ওরফে সাগর (৩০) নেত্রকোণা জেলার মদন উপজেলায় হযরত ফাতেমা তুজ্জহুরা মহিলা কওমি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক| ভুক্তভোগী শিশুটি একই এলাকার বাসিন্দা ও পরিবারের একমাত্র কন্যা সন্তান| শিশুটির বাবা তাদের ছেড়ে দীর্ঘদিন ধরে নিরুদ্দেশ| জীবিকার তাগিদে শিশুটির মা সিলেটে গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন| শিশুটি তার নানির কাছে থেকে ওই মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতো| গত কিছুদিন থেকে শিশুটির মা শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন দেখে ১৮ এপ্রিল মদন উপজেলার মডার্ণ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে শিশুটি ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানা যায়| বাদী শিশুটিকে জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারেন গত ০২ অক্টোবর বিকেল সাড়ে তিনটায় মাদ্রাসা ছুটির পর অভিযুক্ত শিক্ষকের আদেশে ঝাড়ু দিয়ে মাদ্রাসা সংলগ্ন মসজিদের বারান্দা পরিস্কার করতে থাকে| সেই মুহুর্তে ধৃত শিক্ষক শিশুটিকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করে বলে বাদী অভিযোগে উল্লেখ করেন| এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে নেত্রকোণা জেলার মদন থানায় মামলা দায়ের করেন| ঘটনাটি ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত ও আলোচিত হয়|
তিনি জানান, অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের পাঁচহার বড়বাড়ি গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন মিয়ার ছেলে| ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেফতার এড়াতে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়| র্যাব-১৪ এই চাঞ্চল্যকর মামলার ছায়াতদন্ত শুরু করে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে|
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব-১৪ সদর কোম্পানির একটি চৌকস আভিযানিক দল মেজর ইসতিয়াকের নেতৃত্বে বুধবার ভোর সোয়া চারটায় ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর থানার সোনামপুর এলাকা থেকে অভিযুক্ত আমানুল্লাহ মাহমুদী ওরফে সাগরকে (৩০) গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়| গ্রেফতাকৃত সাগর ঘটনার পর পালিয়ে গিয়ে প্রথমে গাজীপুর এবং পরে টঙ্গীতে আশ্রয় নেয়| সেখান থেকে গৌরীপুর চলে আসে| সাগর মোবাইল ব্যবহার না করায় তার গতিবিধি লক্ষ্য রাখা সম্ভব হয়নি| পরে আরো উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে তার অবস্থান নির্ণয় করে গ্রেফতার করা হয়| পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে|
এক প্রশ্নের জবাবে র্যাব অধিনায়ক বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত সাগর অভিযোগ অ¯^ীকার করেছেন| তবে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত দোষী শনাক্ত হবে বলেও মনে করেন তিনি| মেয়েটির চিকিৎসককে হুমকি প্রদানের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে র্যাব অধিনায়ক বলেন, যারা চিকিৎসককে ট্রল করছে তাদের নজরদারি করা হচ্ছে| চিকিৎসকের নিরাপত্তার ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারি সংস্থা তৎপর রয়েছে বলেও জানান তিনি|
জানা যায়, শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর মদন উপজেলার পাঁচহার গ্রামে ২০২২ সালে হযরত ফাতেমা তুজ্জহুরা মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন| একই মাদ্রাসায় তার স্ত্রী প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত আছেন| ভুক্তভোগী মেয়ে একই এলাকার বাসিন্দা| মেয়েটির মা জীবিকার তাগিদে সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন| ভুক্তভোগী মেয়েটি তার নানির কাছে থেকে ওই মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতো| অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর ওই মেয়েটিকে ধর্ষণ করেন| এ ঘটনা কাউকে জানালে মেয়ে ও তার মাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন অভিযুক্ত শিক্ষক| পরবর্তীতে এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখে ওই শিক্ষক ছুটিতে যাওয়ার পর আর মাদ্রাসায় আসেননি| পরবর্তীতে মেয়েটির শারীরিক পরিবর্তন দেখে সন্দেহ হয় পরিবারের| তখন তার মা সিলেট থেকে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারেন মেয়েটি মাদ্রাসার শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে| এরপর তিনি মেয়েকে মদন উপজেলার স্বদেশ ডায়াগনেস্টিক সেন্টারে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সায়মা আক্তারকে দেখান| ডাক্তার সায়মা আক্তার জানান, বাচ্চাটি তার মায়ের সঙ্গে ক্লিনিকে আসে এবং জানায় যে, তার পেটটা সবসময় ভারী লাগে এবং পেটের ভেতর কী জানি নড়ে| আলট্রাসনোগ্রাম করে দেখেন, তার প্রেগনেন্সি ২৭ সপ্তাহ ৫ দিন|




