টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে নদ-নদী ও হাওরের পানির উচ্চতা বেড়ে তলিয়ে গেছে নেত্রকোনার বোরো ফসলী জমি। এতে হাওর ও নিন্মাঞ্চলের প্রায় ৭৮ হাজার কৃষক বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ফলন তলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ৩৭৩ কোটি টাকারও বেশি।
অনেকে কষ্টের ফলন কিছু কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করলেও তা অতি নগণ্য। নদ-নদী ও খাল-বিল উজানের পানিতে ভরে যাওয়ার ফলে ধান শুকানোর খলাগুলোও তলিয়ে গেছে। এতে দীর্ঘ সময় স্তূপ করে রাখা ধান পচে হাওর এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের দাবি, পানিতে ডুবে থেকে ৯০ শতাংশ ধানে চারা গজিয়ে গেলেও টিকে থাকার লড়াইয়ে সেই পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত ধানই সামান্য রোদে শুকিয়ে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন তারা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় মোট বোরো আবাদ হয়েছে এক লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে। অতিবৃষ্টিতে নিমজ্জিত হয়েছে ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমি। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ১৬ হাজার ৮৭৭ দশমিক ৬৫ হেক্টর জমির ধান। উৎপাদনে মোট ক্ষতি ৭৫ হাজার ৯৪৯ দশমিক ৪৩ মেট্রিকটন যার আর্থিক মূল্য ৩৭২ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা। জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক ৭৭ হাজার ৩৬৩জন।
অন্যদিকে হাওরে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে আবাদকৃত ধানের মধ্যে নিমজ্জিত হয় ১১ হাজার ২৩০ হেক্টর আর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্থ জমির পরিমান ১০ হাজার ৭২৭ হেক্টর। উৎপাদনে ক্ষতি ৪৮ হাজার ২৭১ দশমিক ৫০ মেট্রিকটন যার আর্থিক মূল্য ২৩৬ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা এবং হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৩৮ হাজার ২৩৮ জন। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, নেত্রকোনার উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আমিনুল ইসলাম।
ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের তালিকা তৈরী করে প্রনোদণার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে নেত্রকোনা জেলা ত্রাণ ও পূর্নবাসন কর্মকর্তা মো রুহুল আমীন জানান, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে তালিকা তৈরী করা হচ্ছে আগামী রোববার কিংবা সোমবার নাগাদ তা সম্পূর্ন হবে। তিনি আরও জানান, তালিকা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তিনটি ক্যাটাগরিতে সাত হাজার ৫০০, পাঁচ হাজার এবং দুই হাজার ৫০০ টাকা এবং ২০ কেজি করে চাল আগামী তিন মাস বিতরণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সরকারের কৃষি কার্ডের ব্যাপারে জানতে চাইলে খালিয়াজুরি সদরের কৃষক ক্ষিতিশ সরকার বলেন, ‘আমার ১৫ কাটা জমির ধান তলাইয়া গেছে, কিছু ধান তুলছি… তাও আবার জায়গার অভাবে শুকাতে পারছিনা। ২০১৭ সনের বন্যার পর এত বড় ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হইলাম আমরা হাওরের কৃষকরা।’ সাহায্য কার্ডের ব্যাপারে জানতে চাইলে এই প্রান্তিক কৃষক জানান, এখনো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করতে কোনো কর্মকর্তা যোগাযোগ করেননি।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক আঞ্জু মিয়া বলেন, ‘আমাদের ২০ কাটা জমির ধান সব পানিতে তলাইয়া গেছে শ্রমিকের অভাবে কাটা যায় নাই, খেতেই সব নষ্ট ইইছে। বিগত বছরে এই জমিতে প্রতি কাটায় সাত-আট মন করে ১৪০ থেকে ১৫০ মন ধান পাইছি। কিছু ধান খোরাকির রাইখা বাকি বিক্রি কইরা দিছি। এ বছর যে ক্ষতি হইছে তার বর্তমান বাজার মূল্য এক লক্ষ টাকার উপরে। এ ক্ষতি পুরণ হবার নয়।’ সরকারের অনুদানের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কি হইব, অনুদানের টাকায় কয়দিন চলব তাতে। কষ্ট কইরাই চলতে হইব আমাদের।’





