যোগ করা সময়ের ১৯তম মিনিটে যখন রেফারির শেষ বাঁশি বাজল, কানাডার টরন্টোর গ্যালারিজুড়ে তখন এক আবেঘন পরিবেশ। চরম উত্তেজনা ও নাটকে ঠাসা ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ২ু১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে টিকে থাকল পর্তুগাল, নিশ্চিত করল শেষ ষোলোর টিকিট। আর এই পরাজয়ে বিশ্বমঞ্চ থেকে চোখের জলে বিদায় নিলেন লুকা মদরিচের ক্রোয়েশিয়া।
এর আগে ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষ হয়েছিল ০-০ গোলশূন্য সমতায়। ৪ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের পরপর দুটি জোরালো শট ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেওয়ার পর প্রথমার্ধে আর কোনো বড় সুযোগ তৈরি হয়নি। পর্তুগাল ও ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলের ফরোয়ার্ড দিয়োগো জোতার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর আবেগঘন দিনে প্রথমার্ধে দুই দলের কেউই রক্ষণ ভাঙতে পারেনি।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচটি যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। দুই দলই একের পর এক আক্রমণ তুলে এনে জমিয়ে তোলে লড়াই। ৪৮ মিনিটে মাতেও কোভাচিচ বল জালে পাঠিয়েছেন ভেবে ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকেরা উল্লাসে ফেটে পড়লেও বলটি ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে সাইড নেটে আঘাত করায় গোল হয়নি। তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি তাদের। ৫৩ মিনিটে ইভান পেরিসিচের দুর্দান্ত গোলে লিড নেয় ক্রোয়েশিয়া। ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বিশ্বকাপে টিকে থাকার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল।
পিছিয়ে পড়ে গোল শোধে মরিয়া হয়ে ওঠে পর্তুগাল। ৫৮ মিনিটে রাফায়েল লিয়াওয়ের বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া দারুণ বাঁকানো শটটি পোস্টে লেগে ফিরে আসলে গোলবঞ্চিত হয় দল। ৬০ মিনিটে রোনালদো দারুণভাবে বল জালে পাঠিয়ে উদ্যাপনে মাতলেও লাইন্সম্যান অফসাইডের পতাকা তোলায় সেই গোল বাতিল হয়।
তবে ৬৮ মিনিটে সুযোগ পেয়ে আর ভুল করেননি সিআরসেভেন। পেনাল্টি থেকে একদম মাঝ বরাবর নিখুঁত শটে গোলরক্ষককে ভুল দিকে পাঠিয়ে পর্তুগালকে ১-১ সমতায় ফেরান তিনি। চাপের মুহূর্তে শান্ত থেকে গোল করার পর চিরচেনা ভঙ্গিতে দুই হাত মুঠো করে চওড়া হাসিতে সতীর্থদের সঙ্গে উল্লাসে মাতেন রোনালদো।
ম্যাচের ৭৫ মিনিটে অল্পের জন্য এগিয়ে যাওয়া হয়নি ক্রোয়েশিয়ার। কোভাচিচ মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে জোরালো শট নিলেও তা পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বলে তার দ্বিতীয় শটটি দুর্দান্ত ডাইভ দিয়ে অবিশ্বাস্যভাবে সেভ করেন পর্তুগিজ গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা। এরপর ৮১ মিনিটে এক চমকপ্রদ সিদ্ধান্তে অধিনায়ক রোনালদোকে তুলে নিয়ে রুবেন নেভেসকে মাঠে নামান কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। মাঠ ছাড়ার সময় পর্তুগিজ মহাতারকার মুখে কিছুটা হতাশার ছাপ ছিল স্পষ্ট।
রোনালদো মাঠ ছাড়ার পর পর্তুগালের বিশ্বকাপ ভাগ্য তখন সতীর্থদের হাতে। আর সেই ভাগ্যের জট খোলেন বদলি নামা গনসালো রামোস। ৯৪তম মিনিটে রাফায়েল লিয়াওয়ের বাঁ প্রান্ত থেকে বাড়ানো নিখুঁত ক্রসে দুর্দান্ত এক হেডে বল জালে জড়িয়ে পর্তুগালকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন রামোস।
ম্যাচের নাটকীয়তা এখানেই শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ের ১৩তম মিনিটে পর্তুগালের জালে বল জড়িয়ে স্কোরলাইন ২-২ সমতায় এনেছিল ক্রোয়েশিয়া। স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল পর্তুগাল শিবির। কিন্তু ভিএআর পর্যালোচনায় রেফারি অফসাইডের সিদ্ধান্ত দিলে গোলটি বাতিল হয়। উল্লাসে ফেটে পড়ে পর্তুগাল আর স্তব্ধ হয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধান ধরে রেখে মাঠ ছাড়ে পর্তুগাল।
২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে একসঙ্গে ২২২টি ম্যাচ খেলা এবং ১৩টি শিরোপাজয়ী দুই মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং লুকা মদরিচের বিশ্বমঞ্চের শেষ লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসলেন রোনালদো।






